গ্রন্থাগার বাংলা প্রবন্ধ রচনা | স্কুল লাইব্রেরী বা পাঠাগারের সেকাল ও একাল রচনা

গ্রন্থাগার বা স্কুল লাইব্রেরি হলো শিক্ষার্থীদের জ্ঞানভাণ্ডার। এটি এমন একটি স্থান, যেখানে বই, পত্রিকা, জার্নাল ও নানা ধরনের শিক্ষাসামগ্রীর মাধ্যমে মানুষের চিন্তা-চেতনা সমৃদ্ধ হয়। ছাত্রজীবনে গ্রন্থাগারের গুরুত্ব অপরিসীম, কারণ এখান থেকেই শুরু হয় সত্যিকারের জ্ঞানার্জনের পথচলা।

গ্রন্থাগার বাংলা প্রবন্ধ রচনা | স্কুল লাইব্রেরী বা পাঠাগারের সেকাল ও একাল রচনা

ভূমিকা:

“গ্রন্থের আগার ‘গ্রন্থাগার’, —জ্ঞানভান্ডার করে কয়,

দেশ-বিদেশের জ্ঞানসম্পদ, চুপিসারে কথা কয়।”

লাইব্রেরি‘ বা গ্রন্থাগার শিক্ষিত মানুষের বিশেষ করে জ্ঞান পিপাসু মানুষের আশ্রয়স্থল। গ্রন্থাগার সভ্যতার দিকচিন্হ, অতীত ও বর্তমানের সংগমস্থল। মানুষের জ্ঞানরাশি স্থান পায় গ্রন্থে। সেই সকল গ্রন্থ সঞ্চিত হয়ে গড়ে ওঠে গ্রন্থকার হয়ে।

গ্রন্থাগার কি?

গ্রন্থাগার বা প্রকৃত অর্থে পাঠাগার হলো বই, পুস্তিকা ও অন্যান্য তথ্য সামগ্রির একটি সংগ্রহশালা যেখানে পাঠক গ্রন্থপাঠ, গবেষণা ও তথ্যানুসন্ধান করতে পারেন। বাংলা গ্রন্থাগার শব্দটির সন্ধিবিচ্ছেদ করলে ‘গ্রন্থ+আগার’ পাওয়া যায়। অর্থাৎ গ্রন্থাগার হলো গ্রন্থ সজ্জিত পাঠ করার আগার বা স্থান। গ্রন্থাগার হলো জ্ঞানের এমন এক সমুদ্র সেখানে বিচরণ করে প্রতিটি মানুষ উন্নত মননের অধিকারী হতে পারে। আর তাই গ্রন্থাগারকে তুলনা করা হয় শব্দহীন মহাসমুদ্রের সাথে। এটি অতীত বর্তমান ও ভবিষ্যতের মাঝে সেতুবন্ধনের এক নীরব সাক্ষী।

প্রাচীন যুগের গ্রন্থাগার:

প্রাচীন ভারতে যেখানে বিভিন্ন বিষয়ে পুঁথি সংগ্রহ করে রাখা হত, তাকে বলা হতো ‘গ্রন্থকুঠি’। সে-যুগের গ্রন্থাগার নানা নামে পরিচিত ছিল। যেমন— 

  1. ধর্মগঞ্জ
  2. জ্ঞান ভান্ডার
  3. সরস্বতী ভান্ডার।

দক্ষিণ ভারতের তাঞ্জরে এখনও আছে “সরস্বতী মহল”।

কয়েকটি পুরাতন গ্রন্থাগার:

প্রাচীন যুগে জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র তক্ষশীলা, নালন্দা, বিক্রমশিলা, মথুরা, বারানসি প্রভিতি স্থান। ওইসব বিদ্যা কেন্দ্রে গড়ে উঠেছিল এক-একটি পুঁথির সংগ্রহসালা।

একালের গ্রন্থাগার:

আধুনিক যুগে বিদ্যাশিক্ষার প্রসার ঘটেছে। এখন ছাপাখানার কল্যাণে বহু গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। যেইসব গ্রন্থ বেক্তিগত ও সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে গড়ে ওঠা গ্রন্থাগারে সংকলিত ও সংগৃহীত হয়। সেইসব অমূল্য সংগ্রহ মানুষের জ্ঞান ও বিদ্যাচর্চার প্রধান অবলম্বন।

গ্রন্থাগারের মর্মার্থ:

গ্রন্থাগারের বিস্ময়কর ভূমিকাটি সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, “মহাসমুদ্রের শত বৎসরের কল্লোল কেহ যদি এমন করিয়া বাঁধিয়া রাখিতে পারি যে, সে ঘুমাইয়া-পড়া শিশুটির মতাে চুপ করিয়া থাকিত, তবে সেই নীরব মহাদেশের সহিত এই লাইব্রেরির তুলনা হইত। এখানে ভাষা চুপ করিয়া আছে, প্রবাহ স্থির হইয়া আছে, মানবাত্মার অমর আলােক কালাে অক্ষরের শৃঙ্খলে কাগজের কারাগারে বাঁধা পড়িয়া আছে।” সত্যই, যুগ যুগ ধরে জ্ঞান বন্দি হয়ে আছে, চিন্তা আবদ্ধ হয়ে আছে এই গ্রন্থাগারে। যুগ-যুগান্তরের মানুষের কথা পুথির পাতায় নিঃশব্দ নীরবতার মধ্যে বাঁধা পড়ে আছে।

গ্রন্থাগার— শহর ও গ্রাম:

একালের শিক্ষার্থী ও গবেষকদের কাছে পাঠাগারের প্রয়োজনীয়তা কতখানি, টা এরপর আর নতুন করে ব্যাখ্যা করার দরকার হয়না। ছোটো হলেও আমাদের প্রতিটি বিদ্যালয়ে রয়েছে ছোটো একটি পাঠাগার। কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নত মানের পাঠাগার একান্ত ভাবেই আবশ্যক। ইদানিং সরকারি উদ্যোগে প্রতিটি জেলা-শহর ও প্রধান প্রধান নগর গুলিতে বড়ো বড়ো লাইব্রেরী তৈরি করা হয়েছে। এদিকে প্রাচীন গ্রন্থাগার হিসাবে ‘এশিয়াটিক সোসাইটি’ ও ‘জাতীয় গ্রন্থাগার’-এর তুলনা মেলা ভার। দিল্লির ‘মহাফেজখানায় প্রচুর প্রাচীন দলিল ও কাগজপত্র রক্ষিত রয়েছে। এগুলি আমাদের দেশের ইতিহাস লেখার কাজে খুব বেশি দরকারি।

বিভিন্ন গ্রন্থাগারের প্রয়োজনীয়তা:

মনীষীদের নিজের নিজের সংগৃহীত গ্রন্থ থেকে অনেক সময় তাদের বেক্তিগত পাঠাগার তৈরি হয়ে থাকে। শান্তিনিকেতনকে রবীন্দ্রনাথের ব্যাক্তি-সংগ্রহ থেকেই গড়ে উঠেছে একটি পাঠাগার। বিদ্যাসাগর এবং আশুতোষের বেক্তিগত পাঠাগার জমা রয়েছে জাতীয় গ্রন্থাগারে। এইভাবে ‘বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ’ অনেক বেক্তি-সংগ্রহ নিজের পরিষদ ভবনে ধরে রেখেছে। সব বই সকলের পক্ষে কেনা বা সংগ্রহ করা সম্ভব না। গ্রন্থাগার সেখানে ‘মুশকিল আসান’, জ্ঞানতৃষ্ণা মেটাবার নির্ভরযোগ্য স্থান। তাই, এর প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য।

বর্তমানের গ্রন্থাগার: 

আমাদের দেশে কয়েকটি গ্রন্থাগার আছে – কলকাতার জাতীয় গ্রন্থাগার, এশিয়াটিক সােসাইটির গ্রন্থাগার, বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের গ্রন্থাগার। তাছাড়া দেশের প্রত্যেক বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজে, স্কুলে ও বড় বড় শহরে সাধারণ পাঠের জন্য গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তাছাড়া কিছু ভ্রাম্যমাণ গ্রন্থাগারও আমাদের দেশে দেখা যায়।

উপসংহার:

পরিশেষে বলতে হয়, লাইব্রেরী হলো মানবসভ্যতার এক আত্ত্যাসচর্য নির্মাণ। এমন জ্ঞানভাণ্ডার আর কোথাও নেই। পাঠকদের কাছে টানবার জন্য সে হাত বাড়িয়ে আছে। আমাদের শুধু যাওয়ার অপেক্ষা। প্রমথ চৌধুরী বলেছেন, আমাদের দেশে হাসপাতালের চেয়ে গ্রন্থাগারের প্রয়োজনীয়তা অনেক টা বেশি। গ্রন্থাগার মনকে জ্ঞানের আকারে আলোকিত করেসুস্থ করে তোলে। মানুষকে মানুষ করে তোলা। মানুষকে মানুষ করে তোলে। তাই মানবজীবনে গ্রন্থাগারের গুরুত্ব অনেক বেশি।

এই রচনার তথ্য থেকে আরও যে যে প্রবন্ধ রচনা লেখা যায়, সেগুলি হল: আমাদের পড়াশুনায় পাঠাগারের সাহায্য; পাঠাগার ও পাঠক; আধুনিক গবেষণায় পাঠাগারের ভূমিকা; গ্রামের একটি পাঠাগার; স্কুল লাইব্রেরী; পাঠাগারের সেকাল ও একাল; বেক্তিগত গ্রন্থ সংগ্রহ বনাম পাঠাগার;

আরও পড়ুন

  • বৃক্ষচ্ছেদন ও তার প্রতিকার Read →
  • নবজাগরণের পথে বাংলার লোক সংস্কৃতি Read →
  • রক্তদান জীবনদান প্রবন্ধ Read →
  • ফেসবুক : সোশ্যাল মিডিয়া রচনা Read →
  • করোনাকালে অনলাইন শিক্ষা Read →
  • YouTube-এর গুরুত্ব, সুফল, কুফল Read →
  • ডেঙ্গি একটি ভয়াবহ রোগ Read →
  • প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও ছাত্রসমাজ Read →
  • বিজ্ঞান আশীর্বাদ না অভিশাপ? বিজ্ঞানের অশুভ দিক এবং শুভঃ দিক গুলি Read →
  • বিজ্ঞান ও কুসংস্কার বাংলা প্রবন্ধ রচনা Read →
  • তোমার প্রিয় কবি বাংলা প্রবন্ধ রচনা Read →
  • মাতৃভাষায় বিজ্ঞানচর্চা বাংলা প্রবন্ধ রচনা Read →
  • তোমার প্রিয় চলচ্চিত্র : পথের পাঁচালী বাংলা প্রবন্ধ রচনা Read →
  • ছাত্রজীবনের দায়িত্ব ও কর্তব্য বাংলা প্রবন্ধ রচনা Read →
  • একজন আদর্শ স্বাধীনতা সংগ্রামী নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু বাংলা রচনা Read →
  • মোবাইল ফোন বাংলা প্রবন্ধ রচনা Read →
  • বিশ্ব উষ্ণায়ন বাংলা প্রবন্ধ রচনা Read →
  • বিজ্ঞানী আবদুল কালাম বাংলা রচনা Read →
  • করোনা ভাইরাস বাংলা রচনা Read →
  • সাহিত্যপাঠের মূল্য বাংলা রচনা Read →
  • বইপড়া বাংলা রচনা Read →
  • বইপড়া বাংলা রচনা Read →

Leave a Comment

error: Content is protected !!