লতা মঙ্গেশকর নামটি উচ্চারণ করলেই ভেসে ওঠে ভারতীয় সঙ্গীতের এক স্বর্ণযুগের ছবি। “ভারতরত্ন” সম্মানে ভূষিত এই কিংবদন্তি শিল্পী শুধু ভারতের নয়, গোটা বিশ্বের সঙ্গীতপ্রেমীদের হৃদয়ে চিরদিন বেঁচে থাকবেন। মধুর কণ্ঠ, নিখুঁত সুর, সঙ্গীতের প্রতি গভীর নিষ্ঠা—এসব মিলিয়ে লতা মঙ্গেশকর হয়ে উঠেছিলেন সত্যিকারের সুরসম্রাজ্ঞী। তাই আজকের পোস্টে আপনাদের সাথে উপস্থাপন করলাম প্রয়াত সংগীতশিল্পী লতা মঙ্গেশকর রচনা যা যেকোনো পরীক্ষায় বেবহার যোগ্য।

প্রয়াত সংগীতশিল্পী লতা মঙ্গেশকর রচনা
ভূমিকা:
“আমাদের জীবনে আমাদের কখনোই হার মানলে হবে না, আমাদের অবিরাম কাজ করে যাওয়া উচিত, একদিন আমরা অবশ্যই সফলতা অর্জন করবো।” —
লতা মঙ্গেশকর মানুষের জীবনে ঈশ্বরের অসংখ্য, অমূল্য উপহারগুলির মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ উপহার হল সঙ্গীত। মানুষ নিজের গলায় গান গেয়ে, সুমধুর কণ্ঠে গান শুনে এবং শুনিয়ে যে অনাবিল আনন্দ লাভ করে ইহলোকে তেমন আনন্দানুভূতির জুড়ি মেলা ভার। ভারতীয় উপমহাদেশ সেই সুপ্রাচীন যুগ থেকেই উচ্চমানের সঙ্গীতের পীঠস্থান। যুগে যুগে ভারতের বুকে আবির্ভাব ঘটেছে অনন্য সব সঙ্গীত শিল্পীদের। তারা তাদের প্রতিভা দ্বারা শুধু ভারতেরই নয়, সমগ্র পৃথিবীর সঙ্গীত জগৎকে সমৃদ্ধ করে গিয়েছেন।
আধুনিক যুগে ভারতবর্ষের এমনই এক অনন্য সঙ্গীত শিল্পী ছিলেন ভারতরত্ন শ্রীমতি লতা মঙ্গেশকর। তিনি এক হাজারেরও বেশি ভারতীয় ছবিতে গান করেছেন এবং তার গাওয়া মোট গানের সংখ্যা দশ হাজারেরও বেশি। এছাড়া ভারতের ৩৬টি আঞ্চলিক ভাষাতেও তিনি গান গেয়েছেন এবং বিদেশি ভাষায় গান গাওয়ার একমাত্র রেকর্ডটি তারই।
লতা মঙ্গেশকদের জন্ম ও পরিবার:
1921 সালের 28 সেপ্টেম্বর ব্রিটিশ ভারতের ইন্দোর রাজ্যের রাজধানী ইন্দোর শহরে লতা মতোশকের জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা দীনানাথ মস্কোশকর ছিলেন একজন মারাঠি তথা কো কোন ভাষার সংগীতজ্ঞ এবং এক প্রসিদ্ধ মত অভিনেতা। প্রথমা স্ত্রী নর্মদা বিবাহের কিছুদিন পরেই মৃত্যুবরণ করলে তার ছোট বোন সেবন্তীর সঙ্গে দীনানাথ মঙ্গেশকরের পুনর্বিবাহ হয়। বিবাহের কিছু পরে সেবন্তী তার নাম পরিবর্তন করে সুধামতি রাখেন।
এই সুধামতি দেবীই হলেন লতা মস্কোশকরের মা। লতা ছিলেন পরিবারের জ্যেষ্ঠ কন্যা। জন্মের পর তাঁর নাম রাখা হয়েছিল হেমা। যদিও পরবর্তীকালে দীনানাথ মঙ্গেশকরের লেখা একটি নাটকের চরিত্রের নাম অনুসারে হেমা নাম পরিবর্তন করে লতা রাখা হয়। লতা ছাড়াও তাঁর পিতা-মাতার আরও চার সন্তানের প্রত্যেকেই সংগীত জগতে বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেছেন। এরা गा মীনাদিকার, আশা ভোসলে, ঊষা মতোশকর এবং হৃদয়নাথ মঙ্গেশকর।
লতা মঙ্গেশকরের প্রাথমিক জীবন:
লতার জীবনে প্রাথমিক সংগীত শিক্ষার শুরু হয়েছিল তাঁর পিতার কাছেই। মাত্র পাঁচ বছর বয়সে তিনি তাঁর পিতার নির্দেশিত নাটকে, বিভিন্ন গীতিনাট্যে অভিনয় করেছেন। শৈশবকালে বাড়িতে শিশু লতার কে. এল সায়গলের গান ছাড়া আর কিছু গাইবার অনুমতি ছিল না। তাঁর পিতা চাইতেন মেয়ে যেন শুধু ধ্রুপদী সংগীত চর্চাতেই মনোনিবেশ করে। তবে লতার মাত্র 13 বছর বয়সে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে পিতা দীনানাথ মঙ্গেশকরের মৃত্যু হলে তাদের পরিবারে সাময়িক সময়ের জন্য হলেও অনধকার নেমে আসে।
তবে এতে লতার সংগীত শিক্ষায় ছেদ পড়েনি, বরং এই সময়েই তিনি প্রথম পেশাদারি সংগীত জগতে পা রাখেন। মারাঠি ছবি ‘জাভাউ‘ তে তিনি সর্বপ্রথম হিন্দি গানে কণ্ঠ দান করেন। তারপর তিনি সুযোগ পান প্রযোজক শশষর মুখোপাধ্যায়ের ‘শহীদ‘ ছবিতে গান গাওয়ার এবং এর অব্যবহিত পরেই ‘মজবুর‘ সিনেমায় লতা মঙ্গেশকরের গাওয়া “দিল মেরা তোড়া‘ গানটি বিশেষভাবে জনপ্রিয়তা অর্জন করলে তাকে আর পিছনের দিকে ঘুরে তাকাতে হয়নি।
লতা মঙ্গেশকরের প্রাথমিক জীবন:
পিতার মৃত্যুর কিছুদিন পর পারিবারিক অভিভাবক মাস্টার বিনায়ক দামোদর কর্ণাটকার সঙ্গে লতা মঙ্গেশকর মুম্বাইতে চলে আসেন। এখানে প্রস্তান আমন আলী খাঁর এর কাছে ভিক্তিবাজার সংগীত ঘরানার মাধ্যমে হিন্দুস্তানি সংগীতে লতার হাতেখড়ি হয়। 1948 সালে অভিভাবক বিনায়ক দামোদর কর্ণাটকীর মৃত্যু হলে গোলাম হায়দার লতার সঙ্গীতজীবনের অভিভাবকত্বের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন। লতা মঙ্গেশকরের হাত ধরেই ভারতীয় ছায়াছবির গানের জগতে মাহফিল ঘরানার সংগীতের অবসান ঘটে এবং একটি সম্পূর্ণ নতুন প্রকৃতির ঘরানা উঠে আসে। তার গাওয়া উল্লেখযোগ্য কিছু হিন্দি ছায়াছবির গান হল আয়োগা আনে ওয়ালা, রেনা বিতি যায়ে,– ইয়ারা সিলি সিলি, তুঝে দেখা দেখা তো ইয়ে জানা সানাম ইত্যাদি।
বাংলা গানে লতা মঙ্গেশর:
হিন্দি ছায়াছবির গানের পাশাপাশি আরও বিভিন্ন ভাষায় সমগ্র সংগীত জীবনে লতা মঙ্গেশকদা গান রেকর্ড করেছিলেন। যে কয়েকটি ভাষায় লতার ব্যুৎপত্তি ছিল চোখে পড়ার মতো সেই ভাষাগুলির মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ভাষা হল বাংলা ভাষা। বাংলা ভাষায় তিনি দুশোটির বেশি গান রেকর্ড করেছিলেন। হিন্দি ছায়াছবির সংগীতে কাজ করার সময়েই লতার পরিচিতি ঘটে মান্না দে. কিশোর কুমার, শচীনদেব বর্মণ প্রমুখ বাঙালি সংগীত শিল্পীদের সঙ্গ্যে। তাদেরই হাত ধরে বাংলা ভাষার প্রতি লতার বিশেষ আগ্রহ জন্মায়। তার গাওয়া বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য কিছু বাংলা গান হল— সাত ভাই চম্পা, চঞ্চল মন আনমোনা হয়, ও মোর ময়না গো, আষাঢ় শ্রাবণ মানে না তো মন, না যেও না রজনী এখনো বাকি, আকাশ প্রদীপ জ্বলে ইত্যাদি।
লতা মঙ্গেশকরের সুপারহিট গান:
1949 সালে বিখ্যাত একটি গান ‘জিয়া বেকারার হে‘ গেয়ে শ্রোতাদের মধ্যে উত্তর ফেলে দিয়েছিলেন লতা। আবার ‘মন দোলে মেরা প্রাণ দোলে গান দুলিয়েছিল সবার হৃদয়। ‘আজারে পরদেশী‘ ডেকেছিল সমস্ত সংগীত রসিকদের। 85-এর দশকে তিনি গান গেয়েছিলেন নামি-দামি সব শিল্পীদের সাথে এবং ষাটের দশকে মানুষকে উপহার দিয়েছিলেন ‘পেয়ার কিয়া তো ডরনা কিয়া‘। 1963 সালে যখন ভারতের যুদ্ধ শুরু হয় তখন তিনি গাইলেন ‘এ মেরে বতন কে লোগো‘– এই গান শুনে চোখে জল চলে আসে পণ্ডিত জওহারলাল নেহেরুর।
লতা মঙ্গেশকরের প্রাপ্ত পুরস্কারসমূহ:
সমগ্র জীবনে লতা মঙ্গেশকর অসংখ্য পুরস্কার এবং সম্মাননা অর্জন করেছেন। তিনি সর্বোচ্চ অসামরিক সম্মাননা ‘ভারতরত্ন‘ (2001), দ্বিতীয় সর্বোচ্চ অসামরিক পুরস্কার ‘পদ্মবিভূষণ‘ (1999), তৃতীয় সর্বোচ্চ অসামরিক পুরস্কার ‘পদ্মভূষণ‘ (1969) দ্বারা ভূষিত হয়েছেন। 2007 সালে ফ্রান্স সরকার তাকে সর্বোচ্চ অসামরিক সম্মাননা ‘লিজিয়ন অব অনার‘ দ্বারা সম্মানিত করে। এছাড়াও তিনি ‘দাদাসাহেব ফালকে‘ পুরস্কার (1989), মহারাষ্ট্রভূষণ’ পুরস্কার (1997), এন টি আর জাতীয় পুরস্কার (1999), ‘জি সিনে লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড‘ (1999) ইত্যাদি অসংখ্য পুরস্কার দ্বারা ভূষিত হয়েছেন।
দেশের বাইরে তাঁর জনপ্রিয়তা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে 1987 সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র লতা মঙ্গেশকরকে সাম্মানিক নাগরিকত্ব প্রদান করে। পৃথিবীতে সবথেকে বেশি সংখ্যক গান রেকর্ড করার জন্য ‘গিনেস বুক অফ ওয়ার্ল্ড রেকর্ড‘-এ তাঁর নাম ওঠে। তবে সমগ্র সংগীতজীবনে কোটি কোটি শ্রোতাদের কাছ থেকে যে অপরিসীম ভালোবাসা লতা মঙ্গেশকর পেয়েছেন তার থেকে বড়ো সম্মান আর কোনো কিছুই একজন মানুষের জীবনে হতে পারে না।
লতা মঙ্গেশকরের মৃত্যু:
2022 সালের 8 জানুয়ারি কোভিডে আক্রান্ত হয়ে মুম্বাইয়ের গ্রীচ ক্যান্ডি হাসপাতালে ভরতি হন লতা মঙ্গেশকর। করোনা মুক্তও হয়েছিলেন তিনি কিন্তু পরবর্তীকালে শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে। অবশেষে এই কোকিলাকণ্ঠী লতা মঙ্গেশকর 92 বছর বয়সে, ও ফেব্রুয়ারি 2022 সাল, সকাল 8 টা নাগাদ ওই হাসপাতালেই শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন।
উপসংহার:
ভারত তথা গোটা বিশ্বের একজন কিংবদন্তি শিল্পী লতা মঙ্গেশকর সংগীত জগতের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তিনি উপহার দিয়েছেন অসংখ্য, অগুনতি সংগীত। তাঁর মৃত্যুর পর দেশ ও বিদেশ থেকে শোক প্রকাশ করা হয় এবং ভারত সরকার দুর্দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করেন। তবে লতা মঙ্গেশকরের মতো সংগ শিল্পীরা মৃত্যুর বহু ঊর্ধ্বে উঠে সময়কে জয় করে হয়ে ওঠেন কালজয়ী। তাদের নশ্বর শরীরের সমাপ্তি ঘটলেও তাদের প্রতিভা যুগোত্তীর্ণ সংগীত রূপে আমাদের মাঝে চিরকাল জীবিত থাকবে। তিনি ছিলেন, আছেন, থাকবেন।
আরও পড়ুন
- বৃক্ষচ্ছেদন ও তার প্রতিকার Read →
- নবজাগরণের পথে বাংলার লোক সংস্কৃতি Read →
- রক্তদান জীবনদান প্রবন্ধ Read →
- ফেসবুক : সোশ্যাল মিডিয়া রচনা Read →
- করোনাকালে অনলাইন শিক্ষা Read →
- YouTube-এর গুরুত্ব, সুফল, কুফল Read →
- ডেঙ্গি একটি ভয়াবহ রোগ Read →
- প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও ছাত্রসমাজ Read →
- বিজ্ঞান আশীর্বাদ না অভিশাপ? বিজ্ঞানের অশুভ দিক এবং শুভঃ দিক গুলি Read →
- বিজ্ঞান ও কুসংস্কার বাংলা প্রবন্ধ রচনা Read →
- তোমার প্রিয় কবি বাংলা প্রবন্ধ রচনা Read →
- মাতৃভাষায় বিজ্ঞানচর্চা বাংলা প্রবন্ধ রচনা Read →
- তোমার প্রিয় চলচ্চিত্র : পথের পাঁচালী বাংলা প্রবন্ধ রচনা Read →
- ছাত্রজীবনের দায়িত্ব ও কর্তব্য বাংলা প্রবন্ধ রচনা Read →
- একজন আদর্শ স্বাধীনতা সংগ্রামী নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু বাংলা রচনা Read →
- মোবাইল ফোন বাংলা প্রবন্ধ রচনা Read →
- বিশ্ব উষ্ণায়ন বাংলা প্রবন্ধ রচনা Read →
- বিজ্ঞানী আবদুল কালাম বাংলা রচনা Read →
- করোনা ভাইরাস বাংলা রচনা Read →
- সাহিত্যপাঠের মূল্য বাংলা রচনা Read →
- বইপড়া বাংলা রচনা Read →
- বইপড়া বাংলা রচনা Read →

HelpNbuExam বিগত ৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে পশ্চিমবঙ্গের ছাত্রছাত্রীদের জন্য নির্ভুল এবং কোয়ালিটি স্টাডি মেটিরিয়াল প্রদান করছে। আমি “বিকি দাস” আমি একজন লেখক, SEO Expert, Canva ডিজাইনার। 2022-সালে আমি B.A কমপ্লিট করে SEO এর কোর্স করেছি এবং তখন থেকেই বিভিন্ন ব্লগ, ওয়েবসাইটের জন্যে Biography, Content Writer-এর কাজ করছি। ছাত্রদের স্টাডিতে সাহায্য করার উদ্দেশে পরে HelpNbuExam ব্লগ’টি শুরু করেছি। আপনাদের ভালোবাসায় আজকে এখানে।
