আমি একটি গোলাপ ফুল। প্রকৃতির কোলে আমার জন্ম। এক ক্ষুদ্র গাছের ডালে একদিন সকালে শিশিরভেজা রোদ আমার পাপড়িতে পড়তেই আমি প্রথমবার পৃথিবীর আলো দেখেছিলাম। জন্মের পর থেকেই সবাই আমাকে ভালোবাসে—কারণ আমার রঙ, আমার সৌরভ, আর আমার কোমল স্পর্শ মানুষের মনকে মুহূর্তেই মোহিত করে। তাই আজকের পোস্টে আপনাদের সাথে শেয়ার করলাম একটি গোলাপ ফুলের আত্মকথা বাংলা রচনা।

একটি গোলাপ ফুলের আত্মকথা বাংলা রচনা
ভূমিকা:
আমি একটি সদ্য কুঁড়ি থেকে বিকশিত হওয়া সতেজ, সুন্দর গোলাপ। আমার উপর দিয়ে কতই-না আদর আপ্যায়ন, অনাদর, অবহেলা, তাচ্ছিল্য বয়ে গিয়েছে। আজ জীবনের শেষ প্রান্তে এসে কত কথাই না মনে পড়ছে। আমার যাত্রা শুরু হয়েছিল বহু যুগ আগেই। বহু পথ অতিক্রম করে আজ আমি ক্লান্ত, অবসন্ন, দিশেহারা। আমি পড়ে আছি পথের ধারে বা আবর্জনার স্তূপে। আমার বর্ণময় জীবন থেকে আমাকে ছেদন করে এনে নিজেদের প্রয়োজন মিটিয়ে ফেলে দিয়েছে আস্তাকুঁড়ে। আমার অন্তিমকালের অন্তিমতম মুহূর্তে আমি এখন চিরতরে বিলীন হওয়ার অপেক্ষায়।
গোলাপ ফুলের স্মৃতি:
আমার জন্মের ইতিহাস আমার মনে পড়ে না। যখন আমি একটি সুন্দর সুসজ্জিত বাগানে বিকশিত হলাম তখন আমার দর্শনে, ঘ্রাণে সকলেই পুলকিত। মালি আমাকে আদর করে আমার উৎসমূলে জল দিত, খাবার দিত। পরিচর্যা ও দেখাশোনার কোনো অভাব ছিল না আমার। আমাকে নিয়ে কত স্বপ্ন বাগান মালিকের। কখনও গিন্নির খোঁপায়, কখনো-বা অন্য কাউকে উপহার দেওয়ার কথায়।
গোলাপ ফুলের অভিজ্ঞতা:
বাগানে বেশ ভালোই ছিলাম। আমার সঙ্গে আমারই স্বগোত্রীয় ও আত্মীয়রাও ছিল। ছিল আমার মতোই নানা রঙের আপনজন। একদিন ভোরে দেখি একজন আমাকে আমার জন্মনাড়ি থেকে বিছিন্ন করতে একটি ধারালো অস্ত্র নিয়ে আসে। আমি মনে মনে ভাবি এরা আমাকে হত্যা করে। নিজেদের কাজে লাগাবে। তাই দুঃখ হল।
আমি হত্যাকারীর হাতে আমার অস্ত্র কাঁটা ফুটিয়ে দিলাম কিন্তু শেষ রক্ষা হল না আমি কাটা পড়লাম। বিভিন্ন রঙের আমার জাতভাইরাও অনেকে এরকম ভাবে কাটা পড়ল। আমাদের নিয়ে যাওয়া হল একটি ফাঁকা জায়গায়। সেখানে আমাদের গায়ে যে-সমস্ত নোংরা ছিল সেগুলি পরিষ্কার করল। আমাদেরকে একটি কাঠের বাক্সে বন্দি করা হল। এরপর নিয়ে এল রেল স্টেশনে। ট্রেনে চেপে আমরা পাড়ি দিলাম অনেক দূরে।
এরপর বাক্স খুলে আমাদের নামাল। আমাকেও নামাল। আমার স্বগোত্রীদের মাঝ থেকেই আমাকে একজন টাকার বিনিময়ে নিয়ে নিল। আমি চলে এলাম এক বিরাট বড়োলোকের বাড়িতে। এখানে এসেও আমার আদর যত্ন ও প্রশংসার শেষ রইল না। আমার স্থান হল সুসজ্জিত টেবিলের ফুলদানির মধ্যে। আমার বর্তমান মালিক সহ অন্যান্য সকলেই আমার সৌন্দর্যের তারিফ করছিল। এখান পর্যন্ত ঠিকই ছিল।
পরবর্তী দিনগুলি আমার কাছে বিষময় হয়ে উঠল। আমাকে ফেলে দিল বাড়ির বাইরে। আবর্জনা পরিষ্কার করার লোকেরা আমাকে নিয়ে এল এই আস্তাকুঁড়ে। আমার এই বিদায়বেলায় মনে পড়ছে কত স্মৃতি বাগানে যখন ছিলাম লোকে আমার প্রশংসা করলে আমি মনে মনে। ভাবতাম সৌন্দর্যে আমি শীর্ষে। আমি ছিলাম আমাদের সুন্দর সুখী গোলাপ পরিবারে। মালি আমাদের যত্ন করত, খেতেও দিত, পোকামাকড়ের হাত থেকে বাঁচানোর ব্যবস্থা নিত।
গোলাপ ফুলের বিচরণক্ষেত্র:
আমাদের বিচরণক্ষেত্র ছিল সর্বত্র। কখনও বা ড্রয়িং রুমের ফুলদানিতে, কখনও বিয়ের বাসরে, আবার কখনও বা রাজকুমারী বা রাজকুমারের অভ্যর্থনার আসরে। আমরা বাগানে ছাড়াও বাড়ির ছাদে, কার্নিশে, ব্যালকনিতেও আমদের জায়গা ছিল। লোকে আমাদের আদর ও কদর করত যতদিন পর্যন্ত আমরা তরতাজা থাকতাম। আমি কখনও গেছি বিয়েবাড়িতে, মালিক অনুষ্ঠানে অতিথি অভ্যর্থনার টেবিলে, কখনও-বা বাসর শয্যার ঘাটে।
কখনও আমাকে আঠা দিয়ে চিটিয়ে দেওয়া হয়েছে অনুষ্ঠানে ব্যবহৃত যানবাহনে। কখনও রাজকুমার বা রাজকুমারীর হাতে, কখনও পদদলিত হয়েছি পথচারীর, ধুলায় লুণ্ঠিত হয়েছি ঝাড়ুদারের ঝাঁটায়। আমাদের বিচরণ স্থল জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সর্বত্র। কিন্তু দুঃখের বিষয় প্রয়োজনে আমরা খুবই কাছের, নিজের। প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলেই আমাদের কথা কেউ মনে রাখে না।
উপসংহার:
পৃথিবীতে কেউ চিরকাল থাকে না। আমরাও থাকব না। কিন্তু কিছু মানুষ আমাদের অপমৃত্যু নিজেদের স্বার্থসিদ্ধি করে। আমরা কদর পাই মানুষের প্রয়োজনের সময়- তা হয় সৌন্দর্যে নয়তো ব্যবহারে। পৃথিবীবাসীর কাছে আমাদের গোলাপ ফুলের পক্ষ থেকে আবেদন, আমাদের অকালে মেরে ফেলে বাঁচিয়ে রেখে গন্ধ ও সৌন্দর্য উপভোগ করো। সর্বপরি শেক্সপীয়রের সেই বিখ্যাত উক্তিটি স্মরণ করি—“ What’s in a name? That which we call a rose. By any other name would smell as sweet.“
আরও পড়ুন
- বৃক্ষচ্ছেদন ও তার প্রতিকার Read →
- নবজাগরণের পথে বাংলার লোক সংস্কৃতি Read →
- রক্তদান জীবনদান প্রবন্ধ Read →
- ফেসবুক : সোশ্যাল মিডিয়া রচনা Read →
- করোনাকালে অনলাইন শিক্ষা Read →
- YouTube-এর গুরুত্ব, সুফল, কুফল Read →
- ডেঙ্গি একটি ভয়াবহ রোগ Read →
- প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও ছাত্রসমাজ Read →
- বিজ্ঞান আশীর্বাদ না অভিশাপ? বিজ্ঞানের অশুভ দিক এবং শুভঃ দিক গুলি Read →
- বিজ্ঞান ও কুসংস্কার বাংলা প্রবন্ধ রচনা Read →
- তোমার প্রিয় কবি বাংলা প্রবন্ধ রচনা Read →
- মাতৃভাষায় বিজ্ঞানচর্চা বাংলা প্রবন্ধ রচনা Read →
- তোমার প্রিয় চলচ্চিত্র : পথের পাঁচালী বাংলা প্রবন্ধ রচনা Read →
- ছাত্রজীবনের দায়িত্ব ও কর্তব্য বাংলা প্রবন্ধ রচনা Read →
- একজন আদর্শ স্বাধীনতা সংগ্রামী নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু বাংলা রচনা Read →
- মোবাইল ফোন বাংলা প্রবন্ধ রচনা Read →
- বিশ্ব উষ্ণায়ন বাংলা প্রবন্ধ রচনা Read →
- বিজ্ঞানী আবদুল কালাম বাংলা রচনা Read →
- করোনা ভাইরাস বাংলা রচনা Read →
- সাহিত্যপাঠের মূল্য বাংলা রচনা Read →
- বইপড়া বাংলা রচনা Read →
- বইপড়া বাংলা রচনা Read →

HelpNbuExam বিগত ৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে পশ্চিমবঙ্গের ছাত্রছাত্রীদের জন্য নির্ভুল এবং কোয়ালিটি স্টাডি মেটিরিয়াল প্রদান করছে। আমি “বিকি দাস” আমি একজন লেখক, SEO Expert, Canva ডিজাইনার। 2022-সালে আমি B.A কমপ্লিট করে SEO এর কোর্স করেছি এবং তখন থেকেই বিভিন্ন ব্লগ, ওয়েবসাইটের জন্যে Biography, Content Writer-এর কাজ করছি। ছাত্রদের স্টাডিতে সাহায্য করার উদ্দেশে পরে HelpNbuExam ব্লগ’টি শুরু করেছি। আপনাদের ভালোবাসায় আজকে এখানে।
