Vidyasagar Biography: এক মহাপ্রাণ আলোকবর্তিকার জীবনগাথা ও সমাজ সংস্কারের ইতিহাস

উনিশ শতকের বাংলার নবজাগরণের আকাশে যে কটি নক্ষত্র উজ্জ্বলতম হয়ে আবির্ভূত হয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ছিলেন ধ্রুবতারার মতো। তিনি একাধারে সমাজ সংস্কারক, শিক্ষাবিদ, লেখক এবং দয়ার সাগর। আধুনিক বাংলা গদ্যের জনক হিসেবে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। আজকের এই নিবন্ধে আমরা এই মহামানবের জীবন, সংগ্রাম এবং বাঙালির হৃদয়ে তাঁর চিরস্থায়ী আসন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।

Table of Contents

প্রারম্ভিক জীবন ও কঠোর সংগ্রাম: দারিদ্র্য থেকে পাণ্ডিত্যের শিখরে (১৮২০ – ১৮৩৯)

১৮২০ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর মেদিনীপুর জেলার বীরসিংহ গ্রামে এক দরিদ্র ব্রাহ্মণ পরিবারে ঈশ্বরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্ম হয়। তাঁর পিতা ঠাকুরদাস বন্দ্যোপাধ্যায় এবং মাতা ভগবতী দেবী ছিলেন আদর্শনিষ্ঠ মানুষ।

ঈশ্বরচন্দ্রের বাল্যকাল ছিল চরম দারিদ্র্যের মধ্যে অতিবাহিত। কথিত আছে, মেদিনীপুর থেকে কলকাতায় আসার সময় রাস্তার ধারের মাইলস্টোন দেখে তিনি ইংরেজি সংখ্যা চিনেছিলেন। তাঁর জ্ঞানার্জনের তৃষ্ণা এতটাই প্রবল ছিল যে, রাতে বাড়িতে তেলের প্রদীপ জ্বালাবার সামর্থ্য না থাকায় তিনি রাস্তার ল্যাম্পপোস্টের নিচে বসে পড়াশোনা করতেন। এই জেদ এবং অধ্যাবসায় আজও বিশ্বের সকল শিক্ষার্থীর কাছে এক বিশাল অনুপ্রেরণা।

Read moreক্রিপ্টোকারেন্সি বনাম ডিজিটাল রুপি প্রবন্ধ

‘বিদ্যাসাগর’ উপাধি অর্জন (১৮৩৯)

কলকাতার সংস্কৃত কলেজে বারো বছর অধ্যয়নের পর ঈশ্বরচন্দ্র ব্যাকরণ, সাহিত্য, অলঙ্কার, বেদান্ত এবং স্মৃতিশাস্ত্রে অসামান্য ব্যুৎপত্তি লাভ করেন। ১৮৩৯ সালে মাত্র ১৯ বছর বয়সে তাঁর অসাধারণ মেধা ও পাণ্ডিত্যের স্বীকৃতি স্বরূপ কলেজ কর্তৃপক্ষ তাঁকে ‘বিদ্যাসাগর’ (বিদ্যার সমুদ্র) উপাধিতে ভূষিত করেন। এটি কেবল একটি উপাধি ছিল না, বরং তাঁর অগাধ জ্ঞানের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি ছিল।

শিক্ষাসংস্কার ও ‘বর্ণপরিচয়’: বাংলা শিক্ষার ভিত্তিপ্রস্তর

বিদ্যাসাগর উপলব্ধি করেছিলেন যে, সমাজ পরিবর্তনের প্রধান হাতিয়ার হলো শিক্ষা। তাঁর সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব হলো বাংলা বর্ণমালাকে একটি সুশৃঙ্খল কাঠামো দেওয়া।

  • বর্ণপরিচয় (১৮৫৫): বিদ্যাসাগর রচিত ‘বর্ণপরিচয়‘ আজও বাংলা ভাষা শেখার প্রথম সোপান। তিনি বাংলা স্বরবর্ণ ও ব্যঞ্জনবর্ণকে সংস্কার করে সহজবোধ্য করে তোলেন।
  • নারী শিক্ষা: তিনি বিশ্বাস করতেন, “কন্যাপি পালনীয় শিক্ষণীয়া অতীয়ত্নতঃ।” ড্রিঙ্কওয়াটার বিটনের সহযোগিতায় তিনি ১৮৪৯ সালে হিন্দু ফিমেল স্কুল (বর্তমান বেথুন স্কুল) প্রতিষ্ঠা করেন। এছাড়াও তিনি নিজের উদ্যোগে বাংলার বিভিন্ন জেলায় প্রায় ৩৫টি বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করেছিলেন।

Read more- জেনারেটিভ এআই এবং কপিরাইট সমস্যা রচনা

সমাজ সংস্কার ও বিধবা বিবাহ আন্দোলন: এক নির্ভীক লড়াই

বিদ্যাসাগরের জীবনের সবচেয়ে গৌরবময় এবং বিতর্কিত অধ্যায় হলো বিধবা বিবাহ আন্দোলন। সমকালীন রক্ষণশীল হিন্দু সমাজে বিধবাদের দুরবস্থা দেখে তাঁর হৃদয় কেঁদে উঠেছিল।

বিধবা বিবাহ আইন (১৮৫৬)

তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে শাস্ত্রে বিধবা বিবাহের নিষেধ নেই। তাঁর গভীর শাস্ত্রীয় জ্ঞান (Expertise) ব্যবহার করে তিনি পরাশর সংহিতা থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে যুক্তি দেন যে বিশেষ পরিস্থিতিতে বিধবাদের পুনরায় বিবাহ শাস্ত্রমত। তাঁর নিরলস প্রচেষ্টায় এবং আবেদনের প্রেক্ষিতে ১৮৫৬ সালের ২৬ জুলাই লর্ড ক্যানিং ‘হিন্দু বিধবা বিবাহ আইন’ (Act XV) পাশ করেন।

“আমার জীবনের এই সর্বশ্রেষ্ঠ কাজ। এর জন্য যদি আমায় সর্বস্ব ত্যাগ করতে হয়, তাতেও আমি রাজি।” — ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর।

দয়ার সাগর ও চরিত্রের দৃঢ়তা

বিদ্যাসাগর কেবল ‘বিদ্যার সাগর‘ ছিলেন না, তিনি ছিলেন ‘দয়ার সাগর’। অকাতরে আর্তের সেবা এবং দানধ্যান ছিল তাঁর সহজাত প্রবৃত্তি। মাইকেল মধুসূদন দত্ত যখন ঋণে জর্জরিত হয়ে ফ্রান্সে বিপদে পড়েছিলেন, তখন বিদ্যাসাগর তাঁকে বিপুল অর্থ পাঠিয়ে উদ্ধার করেন।

জানতেন কি? (Did You Know?) বিদ্যাসাগর ছিলেন অত্যন্ত সাধারণ জীবনযাপনে অভ্যস্ত। তিনি সবসময় সাধারণ ধুতি এবং চাদর পরে থাকতেন। এমনকি বড় বড় ব্রিটিশ রাজপুরুষদের সাথে দেখা করার সময়ও তিনি নিজের এই দেশীয় পোশাক ত্যাগ করেননি। তাঁর এই আত্মমর্যাদাবোধ বাঙালির চিরকালীন গর্ব।

Read more- মহাকাশ গবেষণার গুরুত্ব রচনা

একনজরে ঐতিহাসিক ঘটনাক্রম

সালঘটনা / কৃতিত্ব
১৮২০বীরসিংহ গ্রামে জন্ম।
১৮৩৯‘বিদ্যাসাগর’ উপাধি লাভ।
১৮৪১ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে প্রধান পন্ডিত হিসেবে যোগদান।
১৮৫৫‘বর্ণপরিচয়’ প্রথম ও দ্বিতীয় ভাগ প্রকাশ।
১৮৫৬বিধবা বিবাহ আইন পাস (২৬ জুলাই)।
১৮৯১২৯ জুলাই কলকাতায় মহাপ্রয়াণ।

সাহিত্যিক অবদান ও গ্রন্থ তালিকা

বিদ্যাসাগর ছিলেন আধুনিক বাংলা গদ্যের স্থপতি। তাঁর লেখনীতে বাংলা ভাষা প্রথম সাবলীল ও ছন্দোময় রূপ পায়।

  • বেতাল পঞ্চবিংশতি (১৮৪৭): বাংলা গদ্যের প্রথম সার্থক উদাহরণ।
  • শকুন্তলা (১৮৫৪): কালিদাসের নাটকের ভাবানুবাদ।
  • সীতার বনবাস (১৮৬০): ভবভূতির নাটকের ছায়া অবলম্বনে রচিত করুণ রসের আখ্যান।
  • কথামালা ও বোধোদয়: শিশুদের নৈতিক শিক্ষার বই।

উপসংহার

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর কেবল একজন মানুষ ছিলেন না, তিনি ছিলেন একটি প্রতিষ্ঠান। তাঁর চরিত্রে ছিল “সিংহের মতো তেজ আর জননীর মতো মমতা”। শিক্ষা, সমাজ সংস্কার এবং বাংলা সাহিত্যের বিকাশে তাঁর অবদান কোনোদিন ম্লান হবে না। বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের জন্য তাঁর জীবন এক জীবন্ত পাঠ্যবই—যিনি শিখিয়েছেন দারিদ্র্য কখনও সফলতার পথে বাধা হতে পারে না।

Read moreJibanananda Das Biography

FAQs

১. বিদ্যাসাগরকে কেন ‘আধুনিক বাংলা গদ্যের জনক’ বলা হয়?

উত্তর: বিদ্যাসাগরই প্রথম বাংলা গদ্যে যতিচিহ্নের (কমা, দাড়ি ইত্যাদি) যথাযথ ব্যবহার শুরু করেন এবং ভাষাকে একটি ছন্দোময় ও কাঠামোবদ্ধ রূপ দেন, তাই তাঁকে এই আখ্যা দেওয়া হয়।

২. তিনি কত সালে বিধবা বিবাহ আইন পাস করান?

উত্তর: ১৮৫৬ সালের ২৬ জুলাই লর্ড ক্যানিংয়ের সহায়তায় তিনি এই আইন পাস করান।

৩. বিদ্যাসাগর রচিত শিশুদের প্রথম পাঠ্যবই কোনটি?

উত্তর: ১৮৫৫ সালে প্রকাশিত ‘বর্ণপরিচয়’ (প্রথম ও দ্বিতীয় ভাগ)।

৪. তাঁর জন্মস্থান বর্তমানে কোন জেলায় অবস্থিত?

উত্তর: তাঁর জন্মস্থান বীরসিংহ গ্রাম তৎকালীন মেদিনীপুর এবং বর্তমানে পশ্চিম মেদিনীপুর জেলায় অবস্থিত।

৫. তাঁকে ‘দয়ার সাগর’ বলা হয় কেন?

উত্তর: আর্তমানবতার সেবা এবং নিঃস্বার্থভাবে মানুষকে দান করার মানসিকতার জন্য রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁকে ‘দয়ার সাগর‘ নামে অভিহিত করেছিলেন।

আরও পড়ুন

  • বৃক্ষচ্ছেদন ও তার প্রতিকার Read →
  • নবজাগরণের পথে বাংলার লোক সংস্কৃতি Read →
  • রক্তদান জীবনদান প্রবন্ধ Read →
  • ফেসবুক : সোশ্যাল মিডিয়া রচনা Read →
  • করোনাকালে অনলাইন শিক্ষা Read →
  • YouTube-এর গুরুত্ব, সুফল, কুফল Read →
  • ডেঙ্গি একটি ভয়াবহ রোগ Read →
  • প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও ছাত্রসমাজ Read →
  • বিজ্ঞান আশীর্বাদ না অভিশাপ? বিজ্ঞানের অশুভ দিক এবং শুভঃ দিক গুলি Read →
  • বিজ্ঞান ও কুসংস্কার বাংলা প্রবন্ধ রচনা Read →
  • তোমার প্রিয় কবি বাংলা প্রবন্ধ রচনা Read →
  • মাতৃভাষায় বিজ্ঞানচর্চা বাংলা প্রবন্ধ রচনা Read →
  • তোমার প্রিয় চলচ্চিত্র : পথের পাঁচালী বাংলা প্রবন্ধ রচনা Read →
  • ছাত্রজীবনের দায়িত্ব ও কর্তব্য বাংলা প্রবন্ধ রচনা Read →
  • একজন আদর্শ স্বাধীনতা সংগ্রামী নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু বাংলা রচনা Read →
  • মোবাইল ফোন বাংলা প্রবন্ধ রচনা Read →
  • বিশ্ব উষ্ণায়ন বাংলা প্রবন্ধ রচনা Read →
  • বিজ্ঞানী আবদুল কালাম বাংলা রচনা Read →
  • করোনা ভাইরাস বাংলা রচনা Read →
  • সাহিত্যপাঠের মূল্য বাংলা রচনা Read →
  • বইপড়া বাংলা রচনা Read →
  • বইপড়া বাংলা রচনা Read →

Leave a Comment

error: Content is protected !!