কিডনি স্টোনের উপসর্গ ও প্রতিকার: আমার ৫এমএম পাথর হওয়ার অভিজ্ঞতা!

বর্তমানে কোমরের ব্যথা সেরকম কোনো ব্যাপার নয়. আপনার কি প্রায় প্রায় কোমরের এক পাশে ব্যথা হয় বা কোমরের যেকোনো জায়গায় ব্যথা হয়। তাহলে এখনই সতর্ক হয়ে যান কারণ কোমরের ব্যথা অনেক কারণের জন্যেই হয়ে থাকে। যদি আপনি কাজ করেন তাহলেও কোমরের ব্যথা হতে পারে। তবে আপনি যদি কাজ না করে থাকেন তাহলে যদি কোমরের ব্যথা হয়ে থাকে তাহলে সেটি কিডনি স্টোনের উপসর্গ হতে পারে।

কিছুদিন আগে আমার নিজেরও এরকমই কোমরের ব্যথা ছিল। কখনো সেই ব্যথা ডান পাশে করতো আবার কখনো বাম পাশে করতো। তারপর আমি একজন উরোলজিস্টকে দেখায় এবং সে আমাকে CT Scan করতে সাজেস্ট করেন। আমি সিটি স্ক্যান করে রিপোর্ট ডাক্তারকে আবার দেখাই তখন আমার কিডনির নিচে অর্থাৎ উরেটারের লাইনে একটি 5MM এর পাথর ধরা পরে।

এছাড়াও কিডনিতে স্টোন হওয়ার আরও অনেক উতসর্গ থাকে যেগুলো আমি বিস্তারিত আলোচনা করেছি।

Symptoms of Kidney Stone

Table of Contents

কিডনি স্টোন আসলে কী?

কিডনি স্টোন বা কিডনিতে পাথর হওয়া আসলে কোনো পাথর নয়; এটি মূলত আপনার প্রস্রাবে থাকা খনিজ (Minerals) এবং লবণের জমাট বাঁধা কঠিন রূপ। নিচে এর বিস্তারিত আলোচনা করলাম।

আমাদের কিডনি রক্ত ছেঁকে বর্জ্য পদার্থ প্রস্রাবের মাধ্যমে শরীর থেকে বের করে দেয়। যখন প্রস্রাবে ক্যালসিয়াম, অক্সালেট বা ইউরিক অ্যাসিডের মতো উপাদানের পরিমাণ খুব বেশি হয়ে যায় এবং প্রস্রাব এই পদার্থগুলোকে দ্রবীভূত (Dissolve) করার মতো যথেষ্ট তরল বা পানি পায় না, তখন এই খনিজগুলো একে অপরের সাথে লেগে স্ফটিক বা ক্রিস্টাল তৈরি করে। এই ক্রিস্টালগুলো ধীরে ধীরে বড় হয়ে পাথরের মতো কঠিন আকার ধারণ করে, একেই কিডনি স্টোন বলে।

কিডনিতে স্টোন হওয়ার আরও কিছু উপসর্গ

নিচে কিডনি স্টোনের প্রধান উপসর্গগুলো বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

১. তীব্র ব্যথা (Renal Colic)

  • এটি কিডনি স্টোনের সবচেয়ে বড় লক্ষণ। এই ব্যথা সাধারণত:
  • পিঠের একপাশে এবং পাঁজরের নিচে তীব্রভাবে শুরু হয়।
  • ব্যথা ধীরে ধীরে কোমরে, তলপেটে এবং কুঁচকির (Groin area) দিকে ছড়িয়ে পড়ে।

এই ব্যথা ঢেউয়ের মতো আসে-যায় এবং কখনো কখনো এর তীব্রতা এত বেশি হয় যে রোগী স্থির থাকতে পারে না, যা আমার নিজের ক্ষেত্রেও হয়েছে।

২. প্রস্রাবের পরিবর্তন

পাথর যখন মূত্রনালীতে ক্ষত সৃষ্টি করে বা বাধা দেয়, তখন প্রস্রাবে কিছু পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়:

  • রক্তযুক্ত প্রস্রাব: প্রস্রাবের রঙ লাল, গোলাপি বা বাদামী হতে পারে (যাকে ডাক্তারি ভাষায় হেমাটুরিয়া বলা হয়) কিছুদিন আগে আমারও এরকম দেখা গেছে এরজন্যে অতিরিক্ত জল পান করাটা আবশ্যক।
  • ঘোলাটে প্রস্রাব: প্রস্রাব স্বচ্ছ না হয়ে ঘোলাটে হতে পারে। এছাড়াও প্রস্রাব থেকে অস্বাভাবিক কটু গন্ধ বের হতে পারে।

৩. প্রস্রাবের সময় অস্বস্তি

  • প্রস্রাব করার সময় তীব্র জ্বালাপোড়া বা ব্যথা অনুভব হওয়া।
  • বারবার প্রস্রাবের বেগ হওয়া কিন্তু খুব সামান্য পরিমাণে প্রস্রাব হওয়া অর্থাৎ প্রস্রাব করার পরও মনে হওয়া যে মূত্রথলি পুরোপুরি খালি হয়নি।

৪. বমি বমি ভাব ও বমি

কিডনি এবং পাকস্থলীর স্নায়ুর মধ্যে গভীর সংযোগ থাকায়, কিডনির তীব্র ব্যথার সাথে প্রচণ্ড বমি বমি ভাব বা বমি হতে পারে। এটি শরীরের একটি স্বাভাবিক প্রতিবর্ত ক্রিয়া (Reflex)।

৫. জ্বর এবং কাঁপুনি

যদি কিডনিতে পাথরের পাশাপাশি ইনফেকশন বা সংক্রমণ হয়ে থাকে, তবে রোগীর প্রচণ্ড জ্বর আসতে পারে এবং শরীর কাঁপতে পারে। এটি একটি গুরুতর লক্ষণ এবং এমন হলে দ্রুত ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া আবশ্যক।

কিডনি স্টোন কীভাবে বা কেন হয়?

পাথর হওয়ার পিছনে বেশ কিছু কারণ কাজ করে:

  • পানির অভাব: এটি সবচেয়ে প্রধান কারণ। পর্যাপ্ত পানি না খেলে প্রস্রাব ঘন হয়ে যায় এবং খনিজ পদার্থগুলো থিতিয়ে পড়ে পাথর তৈরি কর অনেক সাহায্য করে।
  • খাদ্যাভ্যাস: অতিরিক্ত লবণ (সোডিয়াম) এবং প্রোটিন (মাংস) খাওয়ার অভ্যাস ক্যালসিয়ামের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়, যা পাথর হওয়ার ঝুঁকি বাড়ায়। আবার অতিরিক্ত চিনি বা মিষ্টি জাতীয় খাবারও এর জন্য দায়ী হতে পারে।
  • অক্সালেট সমৃদ্ধ খাবার: পালং শাক, চকোলেট, বাদাম বা চা অতিরিক্ত পরিমাণে খেলে অক্সালেট স্টোন হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি থাকে।
  • বংশগত কারণ: পরিবারের কারো কিডনিতে পাথর হওয়ার ইতিহাস থাকলে অন্যদের হওয়ার ঝুঁকিও অনেকটা বেশি থাকে।
  • শারীরিক অবস্থা ও রোগ: স্থূলতা (Obesity), ঘনঘন ইউরিন ইনফেকশন (UTI) যা সর্বপ্রথমে আমারও হয়েছিল, হজমের সমস্যা বা হাইপার-প্যারাথাইরয়েডিজমের মতো হরমোনজনিত সমস্যা থাকলে পাথর হওয়ার প্রবণতা বাড়ে।
  • অতিরিক্ত ভিটামিন ও সাপ্লিমেন্ট: চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অতিরিক্ত ক্যালসিয়াম বা ভিটামিন-সি সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করলেও পাথর হতে পারে।

পাথরের ধরন

পাথরটি কী দিয়ে তৈরি, তার ওপর ভিত্তি করে এগুলো কয়েক ধরনের হয়:

  1. ক্যালসিয়াম স্টোন: এটি সবচেয়ে বেশি দেখা যায় (ক্যালসিয়াম অক্সালেট বা ফসফেট)।
  2. ইউরিক অ্যাসিড স্টোন: যারা কম পানি পান করেন বা অতিরিক্ত প্রোটিন খান, তাদের এটি বেশি হয়।
  3. স্ট্রুভাইট স্টোন: মূলত প্রস্রাবে ইনফেকশনের কারণে এই পাথর হয়।
  4. সিস্টাইন স্টোন: এটি সাধারণত বংশগত কারণে হয়ে থাকে।

Also read

কিডনিতে পাথর এড়ানোর জন্য প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা

কিডনিতে পাথর এড়ানোর প্রধান উপায়গুলো নিচে বিস্তারিত দেওয়া হলো:

১. পর্যাপ্ত পানি পান করা (সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ)

পাথর প্রতিরোধের প্রধান শর্ত হলো শরীরকে হাইড্রেটেড রাখা।

  • পরিমাণ: প্রতিদিন অন্তত ২.৫ থেকে ৩ লিটার জল পান করার চেষ্টা করুন।
  • পরীক্ষা: আপনার প্রস্রাবের রঙ যদি একদম স্বচ্ছ বা হালকা হলুদ হয়, তবে বুঝবেন আপনি যথেষ্ট পানি খাচ্ছেন। প্রস্রাব গাঢ় হলুদ হওয়া মানেই শরীরে জলের অভাব।
  • লেবুর জল: প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় লেবুর রস রাখলে ভালহয়। লেবুতে থাকা সাইট্রেট ক্যালসিয়ামকে জমাট বাঁধতে বাধা দেয় এবং পাথর হওয়া রোধ করে।

২. লবণের ব্যবহার কমানো

  • অতিরিক্ত লবণ বা সোডিয়াম কিডনির মাধ্যমে বেশি ক্যালসিয়াম বের করে দেয়। এই বাড়তি ক্যালসিয়াম প্রস্রাবের সাথে মিশে পাথর তৈরি করে।
  • কাঁচা লবণ খাওয়ার অভ্যাস ত্যাগ করুন।
  • প্রসেসড ফুড, চিপস, চানাচুর এবং টিনজাত খাবার এড়িয়ে চলুন, কারণ এগুলোতে প্রচুর লবণ থাকে।

৩. প্রানিজ প্রোটিন সীমিত করা

অতিরিক্ত লাল মাংস (ছাগল, খাসি), ডিম বা সামুদ্রিক মাছ খেলে শরীরে ইউরিক অ্যাসিডের মাত্রা বেড়ে যায়। এটি যেমন পাথর তৈরির ঝুঁকি বাড়ায়, তেমনি প্রস্রাবে সাইট্রেটের বা পাথর রোধ করার পরিমাণ কমিয়ে দেয়। প্রোটিনের উৎস হিসেবে মাছ বা মাংসের পাশাপাশি ডাল বা মটরশুঁটি জাতীয় উদ্ভিদজাত প্রোটিন বেছে নিন।

৪. ক্যালসিয়াম ও অক্সালেট সমৃদ্ধ খাবারের ভারসাম্য

অনেকেই মনে করেন ক্যালসিয়াম জাতীয় খাবার খেলে পাথর হয়, কিন্তু এটি ভুল ধারণা।

ক্যালসিয়াম: খাবার থেকে প্রাকৃতিক ক্যালসিয়াম (যেমন- দুধ, দই, পনির) গ্রহণ করুন। এটি অন্ত্রে অক্সালেটের সাথে যুক্ত হয়ে পাথর হওয়া রোধ করে। তবে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ক্যালসিয়াম ট্যাবলেট খাবেন না।

অক্সালেট: যদি আপনার আগে পাথর হয়ে থাকে, তবে উচ্চ অক্সালেট যুক্ত খাবার যেমন—পালং শাক, বিট, চকোলেট, বাদাম এবং চা অতিরিক্ত পরিমাণে খাবেন না।

৫. ওজন নিয়ন্ত্রণ ও ব্যায়াম

অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতা কিডনি স্টোনের ঝুঁকি বাড়ায়। নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম বা ব্যায়াম করলে শরীরের মেটাবলিজম ঠিক থাকে এবং খনিজ পদার্থগুলো সঠিকভাবে প্রক্রিয়াজাত হয়।

৬. কোমল পানীয় বর্জন করা

চিনিযুক্ত পানীয় বা কোল্ড ড্রিংকস (বিশেষ করে যেগুলোতে ফসফেট থাকে) এগুলো এড়িয়ে চলুন। এগুলো কিডনিতে পাথর তৈরির প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে।

উপসংহার

পরিশেষে বলা যায়, কিডনির পাথর শুধু একটি শারীরিক সমস্যা নয়, এটি আমাদের অনিয়মিত জীবনযাত্রার একটি সর্তকবার্তা। আমার নিজের অভিজ্ঞতায় দেখেছি, সামান্য কোমরের ব্যথাকে অবহেলা করা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। তবে সঠিক সময়ে রোগ শনাক্ত করা এবং প্রচুর পরিমাণে পানি পানের অভ্যাস থাকলে অস্ত্রোপচার ছাড়াই অনেক সময় মুক্তি পাওয়া সম্ভব। সুস্থ থাকতে হলে আজ থেকেই লবণের পরিমাণ কমান এবং শরীরকে হাইড্রেটেড রাখুন। মনে রাখবেন, প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধই উত্তম। আপনার যদি দীর্ঘস্থায়ী কোমরের ব্যথা থাকে, তবে দেরি না করে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

FAQs

১. কিডনিতে পাথর হলে কি অপারেশন করা বাধ্যতামূলক?

Ans– না, সব ক্ষেত্রে অপারেশন লাগে না। পাথরের আকার যদি ছোট হয় (যেমন ৫-৬ মিমি), তবে প্রচুর পানি পান এবং ওষুধের মাধ্যমে তা প্রস্রাবের সাথে বেরিয়ে যেতে পারে। তবে পাথরের অবস্থান এবং আকার বড় হলে ডাক্তাররা অন্য ব্যবস্থা নিতে পারেন।

২. লেবুর শরবত কি কিডনি স্টোনের জন্য ভালো?

Ans– হ্যাঁ, লেবুতে থাকা সাইট্রিক অ্যাসিড ক্যালসিয়াম স্টোন তৈরিতে বাধা দেয় এবং ছোট পাথর গলতে সাহায্য করে।

৩. কোমর ব্যথার সাথে কিডনি ব্যথার পার্থক্য কী?

Ans– সাধারণ কোমরের ব্যথা সাধারণত নড়াচড়া করলে বাড়ে বা কমে। কিন্তু কিডনি স্টোনের ব্যথা সাধারণত পিঠের এক পাশ থেকে শুরু হয়ে তলপেট বা কুঁচকির দিকে চলে যায় এবং এটি ঢেউয়ের মতো হঠাৎ তীব্র হয়ে আসে।

Leave a Comment

error: Content is protected !!