Sukanta Bhattacharya Biography: মাত্র ২১ বছরেই থামল কলম! কিশোর বিদ্রোহী কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের জীবন

বাংলা সাহিত্যের আকাশে তিনি ছিলেন এক ধূমকেতু। যখন কিশোর বয়সে ছেলেরা খেলাধুলো আর প্রেমে মগ্ন থাকে, তখন তিনি হাতে তুলে নিয়েছিলেন কলম আর বুকে ধারণ করেছিলেন বিপ্লব। তিনি সুকান্ত ভট্টাচার্য (Sukanta Bhattacharya)—যাকে আমরা আদর করে ডাকি ‘কিশোর বিদ্রোহী কবি‘।

মাত্র ২০ বছর বয়সে তিনি বাংলা সাহিত্যকে যা দিয়ে গেছেন, তা অনেক মহাকবি সারা জীবনেও দিতে পারেননি। জন কিটস (John Keats) যেমন ইংরেজি সাহিত্যে অল্প বয়সে ঝরে যাওয়া এক নক্ষত্র, সুকান্তও তেমনি বাংলা সাহিত্যের এক বেদনার নাম। তাঁর কবিতা আজও শোষিত মানুষের রক্তে দোলা দেয়, আজও তরুণদের শেখায় ১৮ বছর বয়সের স্পর্ধা। তাই আজকের Sukanta Bhattacharya Biography থেকে আমরা জানব এই ক্ষণজন্মা প্রতিভার জীবন, সংগ্রাম এবং করুণ পরিণতির ইতিহাস।

Sukanta Bhattacharya Biography

সুকান্ত ভট্টাচার্যর সংক্ষিপ্ত জীবনী

ছাত্রছাত্রীদের প্রজেক্ট এবং সাধারণ জ্ঞানের জন্য সুকান্ত ভট্টাচার্যের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ তথ্যগুলি নিচে টেবিলে দেওয়া হলো:

পূর্ণ নামসুকান্ত ভট্টাচার্য (Sukanta Bhattacharya)
উপাধিকিশোর বিদ্রোহী কবি
জন্ম তারিখ১৫ই আগস্ট, ১৯২৬
জন্মস্থানকালীঘাট, কলকাতা (মাতুলালয়)
পৈতৃক নিবাসকোটালীপাড়া, ফরিদপুর (বর্তমান বাংলাদেশ)
পিতানিবারণচন্দ্র ভট্টাচার্য
মাতাসুনীতি দেবী
বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থছাড়পত্র, ঘুম নেই, পূর্বাভাস, অভিযান
বিখ্যাত কবিতারানার, আঠারো বছর বয়স, মহাজীবন, বোধন
রাজনৈতিক মতাদর্শমার্কসবাদী (কমিউনিস্ট পার্টি)
মৃত্যু তারিখ১৩ই মে, ১৯৪৭
মৃত্যুর কারণযক্ষ্মা (Tuberculosis)
মৃত্যুকালীন বয়স২০ বছর ৮ মাস

সুকান্ত ভট্টাচার্যর শৈশব ও শিক্ষা জীবন

সুকান্তের জন্ম ১৯২৬ সালের ১৫ই আগস্ট, কলকাতার কালীঘাটে তার মামাবাড়িতে হয়েছে। তাঁর পৈতৃক নিবাস ছিল বর্তমান বাংলাদেশের গোপালগঞ্জ জেলার কোটালীপাড়ায়। বাবা নিবারণচন্দ্র ভট্টাচার্য ছিলেন একজন পুস্তক বিক্রেতা এবং মা সুনীতি দেবী ছিলেন এক গৃহিনী। সুকান্ত ছিলেন ভাইবোনদের মধ্যে দ্বিতীয়। তবে মজার বিষয় হলো, পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য হলেন সুকান্ত ভট্টাচার্যের নিজের ভাইপো।

সুকান্তের পড়াশোনা শুরু হয় কলকাতার কমলা বিদ্যামন্দিরে। এরপর তিনি ভর্তি হন বেলেঘাটা দেশবন্ধু হাই স্কুলে। ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী, কিন্তু প্রথাগত পড়াশোনায় তাঁর মন ছিল না। ১৯৪৫ সালে তিনি এন্ট্রান্স পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেন কিন্তু অকৃতকার্য হন। এর মূল কারণ ছিল তাঁর রাজনৈতিক ব্যস্ততা স্কুলের বইয়ের চেয়ে পার্টির কাজ এবং শোষিত মানুষের অধিকার আদায়ের লড়াই তাঁর কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

Read moreWomen Cricket Player Richa Ghosh Biography

সুকান্তের সাহিত্য জীবন

সুকান্তের সাহিত্য জীবন ছিল অত্যন্ত স্বল্পস্থায়ী কিন্তু গভীর। তাঁর লেখার মূল সুর ছিল সাম্যবাদ এবং সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের কথা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বা কাজী নজরুল ইসলামের পর সুকান্তই একমাত্র কবি যিনি এত অল্প বয়সে জাদুকরী প্রভাব বিস্তার করেছিলেন।

ছাড়পত্র (Chharpatra): এটি তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই বইটি প্রকাশিত হয়েছিল তাঁর মৃত্যুর পরে। এই বইয়েই রয়েছে সেই অমর পংক্তি— “এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি, নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।

রানার (Runner): সাধারণ ডাকপিয়ন বা রানার, যারা রোদে পুড়ে বৃষ্টিতে ভিজে মানুষের চিঠি পৌঁছে দেয়, তাদের সুখ-দুঃখের কথা সুকান্তের আগে কেউ এত দরদ দিয়ে ভাবেনি। তিনি লিখেছেন— “রানার! রানার! চলেছে রানার… রাত্রি নির্জন, পথে কত ভয়, তবুও রানার ছোটে।

আঠারো বছর বয়স: তারুণ্যের শক্তি এবং সাহসের প্রতীক এই কবিতা। আজও কলেজে বা বিশ্ববিদ্যালয়ে নবীন বরণের অনুষ্ঠানে এই কবিতাটি আবৃত্তি করা হয়— “আঠারো বছর বয়স কী দুঃসহ, স্পর্ধায় নেয় মাথা তোলবার ঝুঁকি।

সুকান্ত ভট্টাচার্যর রাজনৈতিক জীবন ও সমাজসেবা

মাত্র কিশোর বয়সেই সুকান্ত যোগ দিয়েছিলেন ভারতের কমিউনিস্ট পার্টিতে (CPI)। তিনি শুধু কলমযোদ্ধা ছিলেন না, ছিলেন মাঠের কর্মীও ১৯৪৪ সালে তিনি পার্টির সদস্যপদ লাভ করেন।

১৯৪৩ সালে বাংলায় যখন ভয়াবহ মন্বন্তর (দুর্ভিক্ষ) দেখা দেয়, তখন সুকান্তের ভূমিকা ছিল চোখে পড়ার মতো। তিনি ‘ফ্যাসিবিরোধী লেখক ও শিল্পী সংঘ‘-এর পক্ষে আকাল কবলিত মানুষের সেবায় ঝাঁপিয়ে পড়েন। লঙ্গরখানায় খাবার বিতরণ থেকে শুরু করে ত্রাণের কাজ—সবই করেছেন নিজের শরীরের কথা না ভেবে। এই অতিরিক্ত পরিশ্রমই ধীরে ধীরে তাঁর শরীরকে ভেঙে দিয়েছিল। তিনি সম্পাদনা করতেন ‘কিশোর সভা’ নামক একটি বিভাগ, যা ‘দৈনিক স্বাধীনতা’ পত্রিকায় প্রকাশিত হতো।

Read moreBiography of Cricket Player Swapnil Singh Biography

সুকান্তের ব্যক্তিগত জীবন এবং স্ত্রী প্রসঙ্গ

গুগলে অনেকেই অনুসন্ধান করেন “Sukanta Bhattacharya Wife Name” বা সুকান্তের স্ত্রী কে ছিলেন। স্পষ্ট উত্তর হলো: সুকান্ত ভট্টাচার্য অবিবাহিত ছিলেন।

মাত্র ২০ বছর বয়সে তিনি মারা যান, তাই বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার সময় বা সুযোগ কোনোটাই তিনি পাননি। তবে তাঁর লেখা ‘প্রিয়তমাসু’ কবিতাটি পড়লে মনে হয় তাঁর হৃদয়ে হয়তো কোনো গোপন প্রেম বা ভালোলাগা ছিল। কবিতাটি তিনি লিখেছিলেন তাঁর বৌদি অরুণা দেবীর অনুপ্রেরণায়, নাকি কোনো বিশেষ মেয়ের উদ্দেশ্যে, তা নিয়ে সাহিত্যিকদের মধ্যে দ্বিমত রয়েছে। তবে সাংসারিক জীবন শুরু করার আগেই মৃত্যু তাঁকে আমাদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়েছিল।

সুকান্তের মৃত্যু ও শোকাবহ পরিণতি

অক্লান্ত পরিশ্রম, পার্টির কাজ, অনিয়ম এবং অপুষ্টি—সব মিলিয়ে সুকান্তের শরীরে বাসা বাঁধে মারণ রোগ যক্ষ্মা (Tuberculosis) সেই সময়ে যক্ষ্মার কোনো ভালো চিকিৎসা ছিল না।

১৯৪৭ সাল স্বাধীনতার সূর্য ওঠার ঠিক কয়েক মাস আগে। সুকান্ত তখন যাদবপুর টি.বি. হাসপাতালে (Jadavpur TB Hospital) মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছিলেন। ভাইরা এসে খবর দেন তাঁর বই ছাপার কাজ চলছে, কিন্তু সুকান্ত সেই বই দেখে যেতে পারেননি। ১৯৪৭ সালের ১৩ই মে, মাত্র ২০ বছর ৮ মাস বয়সে এই বিদ্রোহী কবি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

তাঁর মৃত্যুর মাত্র কয়েকদিন পরেই প্রকাশিত হয় তাঁর অমর কাব্যগ্রন্থ ‘ছাড়পত্র’। সুকান্ত চলে গেলেন, কিন্তু রেখে গেলেন এক চিরসবুজ আদর্শ। তিনি প্রমাণ করে গেলেন—প্রতিভা বয়সের ধার ধারে না।

Read moreBiography of Cricket Player Ramakrishna Ghosh

FAQs

১. সুকান্ত ভট্টাচার্যের ডাকনাম কী ছিল?

: সুকান্তের পরিবারের দেওয়া ডাকনাম ছিল ‘কিশোর’। তবে সাহিত্যামোদীরা তাঁকে ‘কিশোর বিদ্রোহী কবি’ নামেই বেশি চেনেন।

২. সুকান্ত ভট্টাচার্য কত বছর বয়সে মারা যান?

: তিনি মাত্র ২০ বছর ৮ মাস বয়সে মারা যান।

৩. সুকান্ত ভট্টাচার্যের সবচেয়ে বিখ্যাত কবিতা কোনটি?

: তাঁর অনেক কবিতাই বিখ্যাত, তবে ‘রানার’, ‘আঠারো বছর বয়স’ এবং ‘ছাড়পত্র’ কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলো সর্বাধিক জনপ্রিয়।

৪. সুকান্ত ভট্টাচার্যের মৃত্যু কীভাবে হয়েছিল?

: অতিরিক্ত পরিশ্রম ও অনিয়মের ফলে তিনি দুরারোগ্য যক্ষ্মা (TB) রোগে আক্রান্ত হয়ে যাদবপুর হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন।

Leave a Comment

error: Content is protected !!