অষ্টাদশ শতকের শেষের দিকে যখন ভারতীয় সমাজ কুসংস্কারের গভীর অন্ধকারে নিমজ্জিত, যখন নারীদের জ্বলন্ত চিতায় স্বামীর সাথে পুড়িয়ে মারা হতো “ধর্মের” নামে, ঠিক তখনই বাংলার আকাশে উদিত হয়েছিল এক নতুন সূর্য—রাজা রামমোহন রায় (Raja Ram Mohan Roy)।
তিনি কেবল সতীদাহ প্রথা রদ করে হাজার হাজার নারীর প্রাণ বাঁচাননি, বরং তিনিই ছিলেন সেই ব্যক্তি যিনি ভারতকে মধ্যযুগীয় অন্ধত্ব থেকে আধুনিকতার পথে নিয়ে এসেছিলেন। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁকে যথার্থই ‘ভারতপথিক‘ এবং ‘ভারতের নবজাগরণের জনক‘ (Father of Modern India) বলে অভিহিত করেছেন। আজ আমরা জানবো সেই মহান সংস্কারক Raja Ram Mohan Roy Biography ও কর্মের ইতিহাস।
Raja Ram Mohan Roy Biography
একনজরে রাজা রামমোহন রায়
| পূর্ণ নাম | রাজা রামমোহন রায় |
| জন্ম তারিখ | ২২ মে, ১৭৭২ |
| জন্মস্থান | রাধানগর, হুগলি জেলা, পশ্চিমবঙ্গ |
| পিতা ও মাতা | রামকান্ত রায় ও তারিনি দেবী |
| উপাধি | রাজা (মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় আকবর প্রদত্ত), আধুনিক ভারতের জনক |
| প্রধান সংগঠন | আত্মীয় সভা (১৮১৫), ব্রাহ্ম সমাজ (১৮২৮) |
| বিখ্যাত পত্রিকা | সংবাদ কৌমুদী (বাংলা), মিরাত-উল-আখবার (ফার্সি) |
| প্রধান সংস্কার | সতীদাহ প্রথা নিবারণ (১৮২৯) |
| মৃত্যু | ২৭ সেপ্টেম্বর, ১৮৩৩ (ব্রিস্টল, যুক্তরাজ্য) |
রাজা রামমোহন রায় প্রারম্ভিক জীবন ও শিক্ষা
১৭৭২ সালের ২২ মে হুগলি জেলার রাধানগর গ্রামে এক রক্ষণশীল ব্রাহ্মণ পরিবারে রামমোহন রায়ের জন্ম হয়। তাঁর পিতা রামকান্ত রায় ছিলেন বৈষ্ণব এবং মাতা তারিনি দেবী ছিলেন শাক্ত।
বাল্যকাল থেকেই রামমোহন ছিলেন অসাধারণ মেধাবী প্রথাগত শিক্ষার জন্য তাঁকে পাটনায় পাঠানো হয়, যেখানে তিনি আরবি ও ফার্সি ভাষায় দক্ষতা অর্জন করেন এবং ইউক্লিড ও অ্যারিস্টটলের দর্শন অধ্যয়ন করেন। পরবর্তীতে তিনি বারাণসীতে (কাশী) গিয়ে সংস্কৃত ভাষা, বেদ ও উপনিষদ নিয়ে গভীর গবেষণা করেন।
ছোটবেলা থেকেই তিনি মূর্তিপুজার বিরোধী ছিলেন। মাত্র ১৫-১৬ বছর বয়সে মূর্তিপুজার অসারতা নিয়ে তিনি একটি পুস্তিকা লেখেন, যার ফলে পিতার সাথে তাঁর মতবিরোধ ঘটে এবং তিনি গৃহত্যাগ করে হিমালয় ও তিব্বত ভ্রমণে বেরিয়ে পড়েন। তিনি বহুভাষাবিদ ছিলেন—বাংলা, সংস্কৃত, আরবি, ফার্সি ছাড়াও ইংরেজি, গ্রিক, হিব্রু ও লাতিন ভাষায় তাঁর দক্ষতা ছিল।
Read more– Pritilata Waddedar Biography
রাজা রামমোহন রায়ের সমাজ সংস্কার আন্দোলন
রাজা রামমোহন রায়ের জীবনের সবচেয়ে বড় অবদান হলো সমাজ সংস্কার। তিনি বিশ্বাস করতেন সমাজকে কুসংস্কার মুক্ত না করলে জাতির উন্নতি অসম্ভব।
সতীদাহ প্রথা নিবারণ
সেসময় হিন্দু সমাজে স্বামীর মৃত্যু হলে বিধবা স্ত্রীকে স্বামীর চিতায় জ্যান্ত পুড়িয়ে মারা হতো। একে বলা হতো ‘সতীদাহ প্রথা’। ১৮১১ সালে রামমোহনের নিজের বড় ভাই জগন্মোহনের মৃত্যুর পর তাঁর বৌদিকে জোর করে চিতায় পোড়ানোর দৃশ্য রামমোহনকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। তিনি এর বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলেন।
তিনি শাস্ত্র ঘেঁটে প্রমাণ করেন যে, হিন্দু ধর্মে সতীদাহ প্রথা বাধ্যতামূলক নয়।
তৎকালীন রক্ষণশীল সমাজপতিরা তাঁর ঘোর বিরোধিতা করেন, এমনকি তাঁকে হত্যার চক্রান্তও করা হয়।
অবশেষে তাঁর প্রচেষ্টায় এবং তৎকালীন গভর্নর জেনারেল লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক (Lord William Bentinck)-এর সহায়তায় ১৮২৯ সালের ৪ ডিসেম্বর ‘সতীদাহ প্রথা’ আইনত নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয় (Regulation XVII)।
অন্যান্য সংস্কার-
নারী শিক্ষা ও অধিকার: তিনি নারীদের সম্পত্তির অধিকার এবং শিক্ষার পক্ষে জোরালো সওয়াল করেন।
কৌলীন্য প্রথা ও বাল্যবিবাহ: তিনি বহুবিবাহ, কৌলীন্য প্রথা এবং বাল্যবিবাহের তীব্র বিরোধিতা করেন।
জাতিভেদ প্রথা: তিনি জাতিভেদ প্রথাকে জাতীয় ঐক্যের পথে বাধা হিসেবে মনে করতেন এবং এর বিলোপ চেয়েছিলেন।
Read more– Sukanta Bhattacharya Biography
রাজা রামমোহন রায়ের শিক্ষা ও সাহিত্য কর্ম
রামমোহন রায় বুঝিয়েছিলেন যে, শুধুমাত্র সংস্কৃত বা মাদ্রাসা শিক্ষা দিয়ে আধুনিক বিশ্বের সাথে তাল মেলানো সম্ভব নয়। তাই তিনি ইংরেজি শিক্ষা ও পাশ্চাত্য বিজ্ঞান শিক্ষার ওপর জোর দেন।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান: ১৮১৭ সালে ডেভিড হেয়ারের সাথে মিলে তিনি হিন্দু কলেজ (বর্তমান প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়) প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৮২৫ সালে তিনি নিজের খরচে বেদান্ত কলেজ স্থাপন করেন, যেখানে ভারতীয় দর্শনের পাশাপাশি পাশ্চাত্য বিজ্ঞান পড়ানো হতো।
সাংবাদিকতা: জনমত গঠনের জন্য তিনি সংবাদপত্রের ওপর গুরুত্ব দেন। তাঁর সম্পাদিত ‘সংবাদ কৌমুদী’ (১৮২১) ছিল বাঙালির লেখা প্রথম বাংলা সাপ্তাহিক পত্রিকা। এছাড়াও তিনি ফার্সি ভাষায় ‘মিরাত-উল-আখবার’ এবং ইংরেজিতে ‘ব্রাহ্মণিক্যাল ম্যাগাজিন’ প্রকাশ করেন।
গদ্য সাহিত্য: বাংলা গদ্যের বিকাশে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। তিনি জটিল সংস্কৃত শব্দ বর্জন করে সহজবোধ্য ভাষায় বেদান্ত গ্রন্থ ও উপনিষদের অনুবাদ করেন।
Read more– US President Donald Trump Biography
ধর্ম সংস্কার: ব্রাহ্ম সমাজ
রামমোহন রায় মনে করতেন, সকল ধর্মের মূল কথা এক—একেশ্বরবাদ (Monotheism)। তিনি হিন্দুদের বহু দেব-দেবীর মূর্তিপুজার পরিবর্তে নিরাকার এক ব্রহ্মের উপাসনার কথা প্রচার করেন।
এই উদ্দেশ্যেই তিনি ১৮১৫ সালে ‘আত্মীয় সভা‘ গঠন করেন।
পরবর্তীতে ১৮২৮ সালের ২০ আগস্ট তিনি ‘ব্রাহ্ম সভা‘ প্রতিষ্ঠা করেন, যা পরে ‘ব্রাহ্ম সমাজ‘ (Brahmo Samaj) নামে পরিচিত হয়। এটি আধুনিক ভারতের প্রথম ধর্মীয় সংস্কার আন্দোলন ছিল।
রাজা রামমোহন রায়ের বিলেত যাত্রা ও মৃত্যু
দিল্লির মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় আকবর তাঁর ভাতার দাবি পেশ করার জন্য রামমোহন রায়কে নিজের দূত হিসেবে ইংল্যান্ডে পাঠান। ইংল্যান্ডে যাওয়ার প্রাক্কালে সম্রাট তাঁকে ‘রাজা‘ উপাধিতে ভূষিত করেন। তিনিই ছিলেন প্রথম ভারতীয় যিনি সমুদ্র পাড়ি দিয়ে বিলেতে গিয়েছিলেন (সেসময় কালাপানি পার হওয়া নিষিদ্ধ ছিল)।
ইংল্যান্ডে থাকাকালীন তিনি মেনিনজাইটিস রোগে আক্রান্ত হন এবং ১৮৩৩ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর ব্রিস্টল শহরে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ব্রিস্টলের আর্নস ভ্যাল সমাধিস্থলে (Arnos Vale Cemetery) তাঁর সমাধি আজও বিদ্যমান।
Read more– Narayan Debnath Biography
FAQs
প্রশ্ন ১: সতীদাহ প্রথা কে এবং কবে নিবারণ করেন?
উত্তর: রাজা রামমোহন রায়ের প্রচেষ্টায় লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক ১৮২৯ সালে সতীদাহ প্রথা নিবারণ আইন পাস করেন।
প্রশ্ন ২: রাজা রামমোহন রায়কে ‘রাজা’ উপাধি কে দিয়েছিলেন?
উত্তর: মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় আকবর (Akbar II) তাঁকে ‘রাজা’ উপাধি দিয়েছিলেন।
প্রশ্ন ৩: ব্রাহ্ম সমাজ কত সালে প্রতিষ্ঠিত হয়?
উত্তর: রাজা রামমোহন রায় ১৮২৮ সালে প্রথমে ব্রাহ্ম সভা প্রতিষ্ঠা করেন, যা পরে ১৮৩০ সালে ব্রাহ্ম সমাজ হিসেবে পরিচিতি পায়।
প্রশ্ন ৪: রামমোহন রায় সম্পাদিত বাংলা সংবাদপত্রটির নাম কী?
উত্তর: সংবাদ কৌমুদী (Sambad Kaumudi)।

HelpNbuExam বিগত ৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে পশ্চিমবঙ্গের ছাত্রছাত্রীদের জন্য নির্ভুল এবং কোয়ালিটি স্টাডি মেটিরিয়াল প্রদান করছে। আমি “বিকি দাস” আমি একজন লেখক, SEO Expert, Canva ডিজাইনার। 2022-সালে আমি B.A কমপ্লিট করে SEO এর কোর্স করেছি এবং তখন থেকেই বিভিন্ন ব্লগ, ওয়েবসাইটের জন্যে Biography, Content Writer-এর কাজ করছি। ছাত্রদের স্টাডিতে সাহায্য করার উদ্দেশে পরে HelpNbuExam ব্লগ’টি শুরু করেছি। আপনাদের ভালোবাসায় আজকে এখানে।
