কেন মাউন্ট কৈলাশে চড়লে মানুষ কয়েক ঘণ্টায় বুড়ো হয়ে যায়? জানুন আসল সত্য!

মাউন্ট এভারেস্টের মতো উচ্চতম শৃঙ্গ জয় করা যেখানে মানুষের কাছে নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে, সেখানে তার চেয়ে ২,২০০ মিটার কম উচ্চতার মাউন্ট কৈলাশকে কেন আজও কোনো মানুষ স্পর্শ করতে পারেনি? এটি কি কোনো অলৌকিক শক্তি, নাকি এর পেছনে রয়েছে কোনো অজানা বিজ্ঞান? ইন্টারনেটে ছড়িয়ে থাকা ‘টাইম ট্রাভেল’ থেকে শুরু করে ‘পিরামিড রহস্য’—সবকিছুর ফ্যাক্ট-চেক নিয়ে আজকের এই বিশেষ প্রতিবেদন।

এরজন্য সবার প্রথমেই আমাদের জেনেনিতে হবে মাউন্ট কৈলাশের ধার্মিক ও আধ্যাত্মিক গুরুত্ব আসলে কি বা কতটা?

মাউন্ট কৈলাশের ধার্মিক ও আধ্যাত্মিক গুরুত্ব

মাউন্ট কৈলাশ শুধুমাত্র একটি পাহাড় নয়, এটি চারটি প্রধান ধর্ম যেমন, হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন এবং বন ধর্মের কাছে অত্যন্ত পবিত্র একটি পর্বত।

  • হিন্দু ধর্ম: বিশ্বাস করা হয় এটি ভগবান শিবের চিরস্থায়ী আবাস।
  • বৌদ্ধ ধর্ম: তাদের মতে এখানে ধ্যানের দেবতা ‘চক্রসম্বর’ বাস করেন।
  • জৈন ধর্ম: প্রথম তীর্থঙ্কর ঋষভদেব এখানেই মোক্ষ লাভ করেছিলেন।
  • বন ধর্ম: তিব্বতের এই প্রাচীন ধর্মমতে, কৈলাশ হলো স্বর্গ ও মর্ত্যের মিলনবিন্দু।

আসল সত্য: এই পর্বত আরোহণ না করার প্রধান কারণ হলো এর ধর্মীয় পবিত্রতা। ২০০১ সালে চীন সরকার আন্তর্জাতিক চাপের মুখে এবং ভক্তদের আবেগের প্রতি সম্মান জানিয়ে মাউন্ট কৈলাশে আরোহণ স্থায়ীভাবে ব্যান্ড করে দিয়েছে।

কেন কেউ কৈলাশ জয় করতে পারেনি?

১. টাইম ডাইলেশন ও দ্রুত বয়স বেড়ে যাওয়া?

ইন্টারনেটে দাবি করা হয় যে কৈলাশের কাছে সময় নাকি দ্রুত চলে এবং ১২ ঘণ্টার মধ্যে নখ ও চুল দুই সপ্তাহের সমান বেড়ে যায়। রাশিয়ার ডাক্তার আর্নেস্ট মুলদাশেভ প্রথম এই দাবি করে ছিলেন।

ফ্যাক্ট-চেক: আইনস্টাইনের রিলেটিভিটি থিওরি অনুযায়ী, সময় শুধুমাত্র গতি ও মাধ্যাকর্ষণ দ্বারা প্রভাবিত হয়। কৈলাশে এমন কোনো বিশেষ চৌম্বক ক্ষেত্র বা মাধ্যাকর্ষণ পাওয়া যায়নি যা সময়ের পরিবর্তন ঘটাতে সক্ষম। মুলদাশেভের দাবিগুলোর কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি বা ‘পিয়ার-রিভিউড’ প্রমাণ নেই, তাই আমরা এটাকে মেনে নিতে পারছি না।

২. সাইবেরিয়ান ক্লাইম্বারদের মৃত্যু রহস্য

বলা হয়, চারজন সাইবেরিয়ান পর্বতারোহী কৈলাশে চড়ার চেষ্টা করেছিলেন এবং এক বছরের মধ্যে বার্ধক্যের কারণে মারা যান।

ফ্যাক্ট-চেক: রাশিয়ার মাউন্টেনিয়ারিং ফেডারেশনের মতে, এমন কোনো অভিযানের রেকর্ড ইতিহাসে নেই। এটি মূলত একটি কাল্পনিক গল্প যা ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়েছে।

৩. কৈলাশ কি একটি কৃত্রিম পিরামিড?

অনেকে মনে করেন কৈলাশ আসলে একটি বিশাল কৃত্রিম পিরামিড যা কোনো উন্নত প্রাচীন সভ্যতা তৈরি করেছিল।

ফ্যাক্ট-চেক: ভূতাত্ত্বিকদের মতে, কৈলাশের পিরামিড সদৃশ আকৃতিটি সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক। প্রায় ২৫ লক্ষ বছর আগে আইস-এজ বা হিমযুগের সময় হিমবাহের ঘর্ষণ ও ক্ষয়কার্যের ফলে এই সুনির্দিষ্ট জ্যামিতিক আকার তৈরি হয়েছে। আল্পস পর্বতমালার ‘ম্যাটারহর্ন’ পাহাড়ও প্রায় একই আকৃতির।

মানসরোবর ও রাক্ষস তালের অদ্ভুত রহস্য

কৈলাশের পাদদেশে দুটি লেক রয়েছে যারা পাশাপাশি অবস্থিত—মানসরোবর (মিষ্টি জল) এবং রাক্ষস তাল (নোনা জল)।

বিজ্ঞান: মানসরোবর একটি উঁচুতে অবস্থিত লেক যেখান থেকে জল উপচে রাক্ষস তালে যায়। রাক্ষস তাল একটি ‘Endorheic‘ লেক, অর্থাৎ এখান থেকে জল বের হওয়ার কোনো পথ নেই। বাষ্পীভবনের ফলে জল উড়ে গেলেও খনিজ লবণগুলো নিচে জমে থাকে, ফলে সময়ের সাথে সাথে এর জল নোনা হয়ে গেছে। এটি একটি স্বাভাবিক প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া যা আমাদের বোঝায় যে প্রথিবীতে ঘটে প্রায়শই সব ঘটনা প্রাকৃতিক।

গাণিতিক অবস্থানের দাবি (৬৬৬৬ কিমি রহস্য)

দাবি করা হয় যে কৈলাশ উত্তর মেরু থেকে ঠিক ৬৬৬৬ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।

ফ্যাক্ট-চেক: আধুনিক গুগল ম্যাপ বা জিপিএস অনুযায়ী এই দূরত্ব প্রায় ৬,৫০০ কিলোমিটার। অর্থাৎ ৬৬৬৬ কিলোমিটারের দাবিটি গাণিতিকভাবে সম্পূর্ণ সঠিক নয়, বরং এটি সংখ্যাতত্ত্বের প্রভাব।

উপসংহার

মাউন্ট কৈলাশ আমাদের শেখায় যে পৃথিবীর সবকিছুই মানুষের ‘জয়’ করার জন্য নয়, কিছু জিনিস শ্রদ্ধা করার জন্যও। যেখানে মানুষ চাঁদ ও মহাকাশ জয় করেছে, সেখানে কোটি কোটি মানুষের বিশ্বাসের প্রতি সম্মান জানিয়ে একটি পাহাড়কে অস্পর্শ রাখা সত্যিই এক আধুনিক অলৌকিক ঘটনা। আপনার কি মনেহয় অবসসই তা আমাদের কমেন্টে জানাবে।

Read more- কেন মাউন্ট কৈলাশে চড়লে মানুষ কয়েক ঘণ্টায় বুড়ো হয়ে যায়?

Leave a Comment

error: Content is protected !!