Matangini Hazra Biography: গান্ধী বুড়ি’র রক্তে লেখা স্বাধীনতার ইতিহাস – জানুন সেই রোমহর্ষক কাহিনী

২৯শে সেপ্টেম্বর, ১৯৪২ সালে মেদিনীপুরের তমলুক শহর তখন বারুদের স্তূপ। ৭২ বছরের এক বৃদ্ধা, জীর্ণ শরীর কিন্তু চোখেমুখে আগ্নেয়গিরির তেজ। হাতে ভারতের তেরঙ্গা পতাকা আর তার সামনে ব্রিটিশ পুলিশের উদ্যত রাইফেল।

গুলি চলল। প্রথমে বাঁ হাতে, তারপর ডান হাতে। কিন্তু পতাকা মাটিতে পড়েনি। কপালে শেষ গুলি লাগার আগেও তাঁর কণ্ঠে ছিল একটাই ধ্বনি— “বন্দেমাতরম!” ইনিই মাতঙ্গিনী হাজরা, যাঁকে আমরা গর্বের সাথে ‘গান্ধী বুড়ি’ বলে ডাকি।

আজকের এই নিবন্ধে আমরা জানব ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের এই বীরাঙ্গনার রোমহর্ষক জীবনী এবং Matangini Hazra Biography-র খুঁটিনাটি।

Matangini Hazra Biography – মাতঙ্গিনী হাজরা জীবনী

একনজরে মাতঙ্গিনী হাজরা

নামমাতঙ্গিনী হাজরা
ডাকনামগান্ধী বুড়ি
জন্ম১৯ অক্টোবর, ১৮৭০
জন্মস্থানগ্রাম: হোগলা, তমলুক, মেদিনীপুর
মৃত্যু২৯ সেপ্টেম্বর, ১৯৪২ (৭২ বছর বয়সে)
ভূমিকাস্বাধীনতা সংগ্রামী
রাজনৈতিক গুরুমহাত্মা গান্ধী
বিখ্যাত স্লোগানবন্দেমাতরম

কঠিন শৈশব ও সংগ্রামী জীবন

মাতঙ্গিনী হাজরার জন্ম ১৮৭০ সালে মেদিনীপুরের তমলুকের হোগলা গ্রামে। তিনি একটি অত্যন্ত দরিদ্র কৃষক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। দারিদ্র্যের কারণে প্রথাগত শিক্ষা বা স্কুলে যাওয়ার সুযোগ তাঁর হয়নি।

মাত্র ১২ বছর বয়সে ত্রিলোচন হাজরার সাথে তাঁর বিয়ে হয়। কিন্তু ভাগ্য সহায় ছিল না কারণ ১৮ বছর বয়সেই তিনি বিধবা হন এবং তাঁর কোনো সন্তান ছিল না। নিঃসন্তান ও বিধবা মাতঙ্গিনী এরপর নিজেকে সমাজসেবা এবং মানুষের উপকারে উৎসর্গ করেন। নিজের কষ্টের জীবন থেকেই তিনি দেশের পরাধীনতার যন্ত্রণা অনুভব করতে শিখেছিলেন।

Read moreIIT Baba Abhay Singh Biography

রাজনীতিতে প্রবেশ ও গান্ধী বুড়ি হয়ে ওঠা

১৯৩০ সালের সময় যখন মহাত্মা গান্ধী দেশজুড়ে লবণ সত্যাগ্রহ আন্দোলন শুরু করেছেন। মেদিনীপুরের মাটিতেও সেই ঢেউ আসে আর তখনই মাতঙ্গিনী হাজরা গান্ধীর আদর্শে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত হন।

  • তিনি খাদি বস্ত্র পরিধান করা শুরু করেন এবং চরকা কাটতে থাকেন।
  • গান্ধীজির প্রতি তাঁর এই অগাধ ভক্তি এবং নিষ্ঠার কারণেই স্থানীয় মানুষ তাঁকে ভালোবেসে গান্ধী বুড়ি নামে ডাকতে শুরু করেন।
  • ১৯৩২ সালে আইন অমান্য আন্দোলনে যোগ দিয়ে তিনি আলিনান লবণ কেন্দ্রে লবণ তৈরি করেন এবং গ্রেফতার হন।

জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পরেও তিনি থামেননি। চৌকিদারি ট্যাক্স বন্ধ করার আন্দোলনেও তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।

১৯৪২-এর ভারত ছাড়ো আন্দোলন ও সর্বোচ্চ আত্মত্যাগ

আগস্ট ১৯৪২ সালের মহাত্মা গান্ধী ডাক দিলেন ভারত ছাড়ো আন্দোলনের। মেদিনীপুরের তমলুকে তখন বিপ্লব দানা বাঁধছে। সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো, ২৯শে সেপ্টেম্বর তমলুক থানা দখল করা হবে।

সেই ঐতিহাসিক দিনে প্রায় ৬,০০০ মানুষের একটি বিশাল মিছিল তমলুক থানার দিকে এগোতে থাকে। আর এই মিছিলের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন ৭২ বছরের বৃদ্ধা মাতঙ্গিনী হাজরা।

Read moreJibanananda Das Biography

সেই রোমহর্ষক মুহূর্ত

মিছিল যখন থানার কাছাকাছি পৌঁছায়, ব্রিটিশ পুলিশ ১৪৪ ধারা জারি করে তাঁদের থামতে বলে। কিন্তু মাতঙ্গিনী থামেননি। তিনি সামনে এগিয়ে যান।

  • পুলিশ প্রথম গুলিটি করে তাঁর বাঁ হাতে। তাঁর হাত থেকে রক্ত ঝরছিল, কিন্তু তিনি তেরঙ্গা পতাকাটি ডান হাতে তুলে নেন।
  • এরপর দ্বিতীয় গুলি লাগে তাঁর ডান হাতে। তবুও তিনি পতাকাটি মাটিতে পড়তে দেননি।
  • ক্রমাগত “বন্দেমাতরম” ধ্বনি দিতে দিতে তিনি এগিয়ে যাচ্ছিলেন। শেষমেশ তৃতীয় বুলেটটি গিয়ে লাগে তাঁর কপালে।

মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ার মুহূর্তেও জাতীয় পতাকাটি তাঁর হাতে উঁচিয়ে ধরা ছিল। Tamralipta Jatiya Sarkar-এর ঐতিহাসিক নথি অনুযায়ী, এই আত্মত্যাগই মেদিনীপুরের মানুষকে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে এক সমান্তরাল সরকার গঠনে উদ্বুদ্ধ করেছিল।

উত্তরাধিকার ও সম্মান

মাতঙ্গিনী হাজরার এই বলিদান বৃথা যায়নি। তাঁর মৃত্যুর পরই মেদিনীপুরে অজয় মুখোপাধ্যায় এবং সতীশচন্দ্র সামন্তর নেতৃত্বে তাম্রলিপ্ত জাতীয় সরকার গঠিত হয়, যা প্রায় দুই বছর স্বাধীনভাবে শাসনকার্য চালায়।

  • প্রথম মহিলা মূর্তি: ১৯৭৭ সালে কলকাতার ময়দানে মাতঙ্গিনী হাজরার মূর্তি স্থাপন করা হয়। এটিই ছিল ময়দানে স্থাপিত কোনো মহিলার প্রথম মূর্তি।
  • তমলুক শহরে তাঁর মৃত্যুস্থলে একটি স্মৃতিস্তম্ভ রয়েছে।
  • কলকাতা ও পশ্চিমবঙ্গের বহু রাস্তা এবং স্কুল তাঁর নামে নামাঙ্কিত, যেমন হাজরা রোড।

Read moreAssam Archita Phukan Biography

উপসংহার

মাতঙ্গিনী হাজরার জীবনী কেবল ইতিহাসের একটি অধ্যায় নয়, এটি সাহসের এক জ্বলন্ত সত্য। ৭২ বছর বয়সেও দেশের জন্য প্রাণ দেওয়ার যে দৃষ্টান্ত তিনি স্থাপন করেছিলেন, তা আজও আমাদের শিহরণ জাগায়।

ছাত্রছাত্রীদের কাছে মাতঙ্গিনী হাজরা এক অফুরান অনুপ্রেরণার উৎস। তাঁর জীবন আমাদের শেখায়, দেশপ্রেমের কোনো বয়স হয় না। আসুন, আমরা এই মহীয়সী নারীর আত্মত্যাগকে স্মরণ করি এবং দেশের প্রতি আমাদের দায়িত্ব পালন করি।

জয় হিন্দ!

Read moreKazi Nazrul Islam Biography

FAQs

১. মাতঙ্গিনী হাজরাকে ‘গান্ধী বুড়ি’ বলা হয় কেন?

Ans– মহাত্মা গান্ধীর আদর্শে তিনি গভীরভাবে বিশ্বাসী ছিলেন। গান্ধীর মতো তিনি খাদি পরতেন, চরকা কাটতেন এবং অহিংস আন্দোলনে বিশ্বাসী ছিলেন। তাই স্থানীয়রা তাঁকে ভালোবেসে ‘গান্ধী বুড়ি’ বলত।

২. মাতঙ্গিনী হাজরা কত সালে মারা যান?

Ans– তিনি ১৯৪২ সালের ২৯শে সেপ্টেম্বর ভারত ছাড়ো আন্দোলনের সময় ব্রিটিশ পুলিশের গুলিতে শহীদ হন।

৩. তমলুক থানা অভিযানের সময় কী ঘটেছিল?

Ans– ১৯৪২ সালে মাতঙ্গিনী হাজরার নেতৃত্বে বিশাল মিছিল তমলুক থানা দখলের উদ্দেশ্যে যায়। পুলিশ গুলি চালালে তিনি তিনটি গুলি বিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই শহীদ হন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত জাতীয় পতাকা হাতছাড়া করেননি।

Leave a Comment

error: Content is protected !!