Khudiram Bose Biography: হাসি মুখে ফাঁসি বরণ করা অগ্নিযুগের সেই কিশোরের গল্প

ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে অনেক বীরের নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে, কিন্তু মাত্র ১৮ বছর বয়সে হাসিমুখে ফাঁসির দড়ি গলায় পরা সেই কিশোরের নাম শুনলে আজও প্রতিটা বাঙালির গায়ে কাঁটা দেয়। তিনি আর কেউ নন, মেদিনীপুরের অকুতোভয় সন্তান ক্ষুদিরাম বসু। তাঁর আত্মত্যাগ কেবল ব্রিটিশ শাসনের ভিত কাঁপিয়ে দেয়নি, বরং বাংলার হাজার হাজার যুবককে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করেছিল।

Khudiram Bose Biography

এক নজরে ক্ষুদিরাম বসুর পরিচয়

বিষয়তথ্য
পুরো নামক্ষুদিরাম বসু
জন্ম তারিখ৩ ডিসেম্বর, ১৮৮৯
জন্মস্থানমোহবনী গ্রাম, মেদিনীপুর জেলা (বর্তমানে পশ্চিম মেদিনীপুর)
পিতা ও মাতাত্রৈলোক্যনাথ বসু ও লক্ষ্মীপ্রিয়া দেবী
বিপ্লবী আদর্শে দীক্ষাগুরুসত্যেন্দ্রনাথ বসু
বিপ্লবী সংগঠনযুগান্তর দল ও অনুশীলন সমিতি
শহিদ দিবস১১ আগস্ট, ১৯০৮ (মুজাফফরপুর জেল)

শৈশব ও বিপ্লবী জীবনের সূচনা

১৮৮৯ সালে মেদিনীপুরের মোহবনী গ্রামে ক্ষুদিরামের জন্ম। শৈশবে মা-বাবাকে হারানো এই কিশোরের বেড়ে ওঠা ছিল দিদি অপরূপা দেবীর আশ্রয়ে। ছোটবেলা থেকেই তাঁর চোখে ছিল এক অদ্ভুত জেদ আর দেশের প্রতি গভীর টান। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন বাংলার আকাশ-বাতাস যখন উত্তপ্ত করে তুলেছে, তখন মাত্র ১৬ বছর বয়সেই তিনি বিপ্লবী সংগঠন ‘অনুশীলন সমিতি‘-তে যোগ দেন।

সত্যেন্দ্রনাথ বসুর নির্দেশনায় তিনি বোমা তৈরি এবং রাজনীতির পাঠ নিতে শুরু করেন। তাঁর কাছে দেশ ছিল গর্ভধারিণী মায়ের মতো, আর সেই মাকে পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করাই ছিল তাঁর জীবনের একমাত্র লক্ষ্য।

Read more- Jibanananda Das Biography

মুজাফফরপুর কাণ্ড: কিংসফোর্ড হত্যা পরিকল্পনা

১৯০৮ সাল। ব্রিটিশ ম্যাজিস্ট্রেট ডগলাস কিংসফোর্ড বিপ্লবীদের ওপর অকথ্য অত্যাচার চালানোর জন্য কুখ্যাত হয়ে উঠেছিলেন। তাঁকে শেষ করার দায়িত্ব দেওয়া হয় দুই নির্ভীক তরুণ— ক্ষুদিরাম বসু এবং প্রফুল্ল চাকীকে

৩০শে এপ্রিল রাতে বিহারের মুজাফফরপুরে কিংসফোর্ডের ফিটন গাড়ি লক্ষ্য করে বোমা নিক্ষেপ করেন তাঁরা। কিন্তু নিয়তির পরিহাসে সেই গাড়িতে কিংসফোর্ড ছিলেন না, ছিলেন ব্যারিস্টার প্রিংলে কেনেডির স্ত্রী ও কন্যা। এই অনিচ্ছাকৃত ভুলের জন্য ক্ষুদিরাম সারাজীবন অনুতপ্ত ছিলেন।

ঘটনার পর প্রফুল্ল চাকী পুলিশের হাতে ধরা দেওয়ার আগেই আত্মবলিদান দেন, কিন্তু ক্ষুদিরাম ধরা পড়েন ওয়াইনি (Waini) রেল স্টেশনে।

Read more- Matangini Hazra Biography

বিচার ও হাসি মুখে ফাঁসি বরণ

আদালতে যখন বিচার চলছিল, ক্ষুদিরাম ছিলেন শান্ত ও অবিচল। জজ যখন তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দিলেন, তিনি বিন্দুমাত্র বিচলিত হননি। বরং হাসিমুখে জানতে চেয়েছিলেন, জজ সাহেব তাঁকে বোমা বানানোর কৌশল শিখতে দেবেন কি না!

১১ আগস্ট, ১৯০৮। ভোরবেলা মুজাফফরপুর জেলে যখন তাঁকে ফাঁসির মঞ্চে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, তাঁর হাতে ছিল শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা। কোনো ভয় নেই, কোনো আক্ষেপ নেই— কেবল এক বুক দেশপ্রেম। ১৮ বছর ৮ মাস ৮ দিন বয়সে তিনি বীরের মতো শহিদ হলেন।

“একবার বিদায় দে মা ঘুরে আসি। হাসি হাসি পরব ফাঁসি দেখবে জগৎবাসী।” — এই গানটি আজও আমাদের মনে করিয়ে দেয় সেই অজেয় কিশোরের কথা।

ক্ষুদিরাম বসুর উত্তরাধিকার

ক্ষুদিরাম কেবল একজন বিপ্লবী ছিলেন না, তিনি ছিলেন প্রতিবাদের এক জীবন্ত প্রতীক। তাঁর ফাঁসির পর বাংলার তাঁতিরা ধোতির পাড়ে ‘ক্ষুদিরাম’ নাম লিখে কাপড় বুনতেন। তাঁর আত্মবলিদান মাস্টারদা সূর্য সেন থেকে শুরু করে বাঘা যতীন— সবার মনে স্বাধীনতার আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছিল।

Read more- Vidyasagar Biography

FAQs

১. ক্ষুদিরাম বসুর ফাঁসি কেন হয়েছিল?

Ans– ম্যাজিস্ট্রেট কিংসফোর্ডকে হত্যার উদ্দেশ্যে বোমা ছোড়ার অভিযোগে (মুজাফফরপুর ষড়যন্ত্র মামলা) ক্ষুদিরাম বসুর ফাঁসি হয়েছিল।

২. ক্ষুদিরামের ফাঁসির সময় তাঁর বয়স কত ছিল?

Ans– ফাঁসির সময় তাঁর বয়স ছিল মাত্র ১৮ বছর ৮ মাস ৮ দিন। তিনি ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম সর্বকনিষ্ঠ শহিদ।

৩. ক্ষুদিরামের সাথে মুজাফফরপুর অভিযানে আর কে ছিলেন?

Ans– ক্ষুদিরামের সাথে ছিলেন বিপ্লবী প্রফুল্ল চাকী।

উপসংহার

ক্ষুদিরাম বসু কেবল একটি নাম নয়, তিনি ছিলেন পরাধীন ভারতের শৃঙ্খল ভাঙার প্রথম বজ্রনিঘোষ। যে বয়সে সাধারণ কিশোরেরা নিজেদের ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্নে বিভোর থাকে, সেই বয়সে তিনি দেশের চরণে নিজের জীবন পুষ্পাঞ্জলি হিসেবে অর্পণ করেছিলেন। মেদিনীপুরের সেই ধুলোমাটি থেকে উঠে আসা ছেলেটি মুজাফফরপুর জেলের ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়িয়ে প্রমাণ করে দিয়েছিলেন যে, আদর্শের জন্য মৃত্যুকে আলিঙ্গন করা যায়, কিন্তু অন্যায়ের কাছে মাথা নত করা যায় না।

আজকের স্বাধীন ভারতে দাঁড়িয়ে যখন আমরা মুক্ত বাতাসে নিঃশ্বাস নিই, তখন ক্ষুদিরামের সেই অম্লান হাসি আমাদের মনে করিয়ে দেয়— এই স্বাধীনতার মূল্য কতটা রক্তক্ষয়ী ছিল। তিনি আমাদের হৃদয়ে চিরকাল অমর হয়ে থাকবেন এক মৃত্যুঞ্জয়ী মহানায়ক হিসেবে, যাঁর ত্যাগ আজও প্রতিটি দেশপ্রেমিক ভারতীয়র প্রেরণার উৎস।

Read more- জেনারেটিভ এআই এবং কপিরাইট সমস্যা

Leave a Comment

error: Content is protected !!