ডোকরা শিল্প – ডোকরা শিল্প সম্পর্কে আলোচনা কর। 

বন্ধুরা আজকে তোমরা এখানে পড়বে, ডোকরা শিল্প সম্পর্কে (Dokra Silpo Somporke) সবকিছু যদি তোমাদের কোন পরীক্ষাতে ডোকরা শিল্প সম্পর্কিত কোনো রকমের প্রশ্ন এসে থাকে তাহলে তোমরা আমাদের দেওয়া আজকের এই প্রতিবেদনটি ভালো করে পড়বে পরীক্ষাতে লিখার জন্য। 

Q. ডোকরা শিল্প সম্পর্কে আলোচনা কর? (Understanding Popular Culture)

Answer:

বছর পঞ্চাশ আগেও ডোকরাদের কথা কম শোনা যেত। শান্তিনিকেতনে বা কলকাতায় তখনও কারোর বাড়িতে ডোকরা কাজ দেখা যেত না। সম্ভবত, ১৯৭০- এর কাছাকাছি সময় মানিদা অর্থাৎ শিল্পী কে জি সুব্রহ্মন্যন শান্তিনিকেতনে অতিথি অধ্যাপক হয়ে আসার পরে ছাত্রদের শেখাবার জন্যে কলাভবনে ডোকরাদের নিয়ে আসা হল। তখনই জানা গেল যে পুরনো ভাঙাচোরা কাঁসা পিতলের জিনিস থেকে ডোকরারা নানারকম মূর্তি বানাতে পারে। তখন সাধারণভাবে শান্তিনিকেতনের মানুষদের মধ্যে ডোকরাদের নিয়ে বিশেষ কৌতূহল ছিল না। কলাভবনের বাড়িগুলির বাইরে কাঁকড়ের জমিতে বসে ওরা কাজ করত।

ওই সময়ের আগেই সরকারের হস্তশিল্প অধিকার, বিখ্যাত কারুশিল্প ও হস্তশিল্প বিশেষজ্ঞ কমলাদেবী চট্টোপাধ্যায়ের তত্ত্বাবধানে ডোকরা শিল্প চর্চা শুরু করেছিল। বিশ শতকের পাঁচের দশক থেকেই ডোকরা শিল্পীদের হস্তশিল্প অধিকারের কেন্দ্রীয় কারিগরির জায়গায় নিয়ে গিয়ে কাজ করানো হচ্ছিল। এইরকম একজন ওস্তাদ শিল্পী বা কারিগর মটর কর্মকারের সঙ্গে বছর পনর আগে পরিচয় হয়েছিল। – শান্তিনিকেতনের পৌষমেলাতে সম্ভবত বছর ত্রিশেক ধরে ডোকরা শিল্পের কাজ আসছে।

শান্তিনিকেতনের নিকটতম ডোকরা শিল্পীদের গ্রাম হল দ্বারিয়াপুর, বা বেশি প্রচলিত নাম দরিয়াপুর। দ্বারিয়াপুর যেতে হলে গুস্করা স্টেশনে নেমে মাইল তিনেক আউসগ্রামের দিকে যেতে হবে। ডোকরা একটি আদিবাসী গোষ্ঠীর নাম। এদের আদি নিবাস সম্ভবত মধ্যপ্রদেশের বস্তারে (এখন ছত্তিসগড়)। সেখান থেকে এদের অনেকে ক্রমশ ওড়িষার ঢেঙ্কানলে, সাঁওতাল পরগণার দুমকায়, বাঁকুড়ার বিকনায় আর বর্ধমান জেলার দরিয়াপুরে ছড়িয়ে পড়ে। এরা প্রকৃতিতে যাযাবর। সাঁওতালদের মত নির্দিষ্ট জায়গায় বসবাসকারী আদিবাসী গোষ্ঠী নয়। এদের বসবাসের জায়গাগুলিও সাঁওতালদের মত সাজানো গোছানো নয়।

সাঁওতালদের ঘরের দাওয়া দেয়াল পরিষ্কার করে নিকোনো থাকে। ঘরের দেয়াল বিশেষ করে বাইরের দেয়াল রিলিফ করা মূর্তি বা রঙের আলপনা দিয়ে সাজানো থাকে। ডোকরাদের ঘর দুয়ার সাজানো নয়, শিল্পকর্মে শোভিত নয়। এক কথায় বলা যায়, দায়সারা আর অপরিচ্ছন্ন গোছের। ডোকরাদের শিল্পপ্রবণতা প্রকাশিত হয় তাদের হাতের কাজে। কাঁসা- পিতলের তৈরি নানা রকমের মূর্তি, কিছু ব্যবহারের জিনিসের মধ্যে ডোকরাদের শিল্প চেতনা বিকশিত হয়। ‘ডোকরা‘ শব্দটা বিশেষ এই আদিবাসী গোষ্ঠীর নাম ও তাদের হাতের কাজ উভয় অর্থেই ব্যবহৃত হয়।

গত পঁচিশ ত্রিশ বছর ধরে পৌষমেলাতে দ্বারিয়াপুর ও দুমকা থেকে অনেক রকমের ডোকরা শিল্পের কাজ আসছে। সাধারণত দ্বারিয়াপুরের জিনিসগুলি বেশি হলুদ রঙের আর দুমকার জিনিসগুলি তুলনায় বেশি তামাটে রঙের। এইসব ডোকরা কাজগুলির দুরকমের ব্যবহার হতে পারে। বেশির ভাগই হল ঘর সাজানোর জিনিস – যেমন, প্যাঁচা, ঘোড়া, হাতি, পালকি। কিছু থাকে ঠাকুর-দেবতার মূর্তি — গণেশ, কালী, দুর্গা ইত্যাদি। এইসব ঠাকুর-দেবতার মূর্তিও ঘর সাজাবার জন্য ব্যবহার হয়।

ডোকরা ঠাকুর-দেবতার মূর্তি পূজার বিগ্রহ হিসাবে ব্যবহার হয় না। ঘর সাজানো ছাড়া গয়না হিসেবে কিছু জিনিস বানানো হয়। গয়নার মধ্যে আছে বালা, হারের লকেট, কানের দুল ইত্যাদি। আগেকার কালে এত রকমের জিনিস ডোকরাদের কাজের মধ্যে ছিল না। ঐতিহ্যগতভাবে ডোকরারা তৈরি করত চাল মাপার পাত্র যাকে বলে, পাই বা কুনকে, আর লক্ষ্মী প্যাঁচা। ডোকরা পুরুষরা ফেরিওয়ালার মত পথে পথে ঘুরে গৃহস্থদের কাছে কাজ যোগাড় করত। গৃহস্থ বাড়ির পরিত্যক্ত কাঁসা- পিতলের বাসনের টুকরো নিয়ে গৃহস্থ বাড়ির প্রাঙ্গণে বসেই পাই বা লক্ষ্মী প্যাঁচা বানিয়ে দিত।

প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের দিক থেকে ডোকরা পরিবার হিন্দু বা মুসলমান হতে পারে। বিবাহিতা মেয়েরা সব ক্ষেত্রে মাথায় সিঁদুর দেয়। সম্ভবত এদের আদি প্রকৃতিতে যাযাবর-ঝোঁক বলেই এদের সংসার গোছাবার বা ভাল করে বসতবাড়ি বানাবার দিকে মন নেই। ঘরগুলির ঢোকার পথ নিচু, ঘরে আলো-হাওয়া খেলানোর ব্যবস্থা নেই। হস্তশিল্প অধিকারের আওতায় আনার পরে নানা রকম সরকারি সাহায্য ও উদ্যোগে এদের পরিবেশ ও জীবনযাত্রা ভাল করবার চেষ্টা হয়েছে।

বিভিন্ন ডোকরা গ্রামে সমবায় গঠন করার চেষ্টা হয়েছে। সমবায়ের জন্য পাকা বাড়ি তৈরি করে দেওয়া হয়েছে। পাকা ও মজবুত ড্রেন তৈরি করে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এইসব সরকারি ব্যবস্থা সত্ত্বেও ডোকরা গ্রামগুলির শ্রী ফেরেনি। সাঁওতাল গ্রামের পাশাপাশি ডোকরাদের গ্রাম দেখলেই জীবনযাত্রার শ্রী ও শৃঙ্খলার প্রভেদটা চোখে পড়বে।

Leave a Comment

error: Content is protected !!