ভারতে সস্তা ইন্টারনেটের অন্ধকার দিক: কেন বারবার বাড়ছে রিচার্জের দাম?

২০১৬ সালে ভারতে যখন প্রথম জিও নিয়ে এসেছিলো, তখন ‘ফ্রি ইন্টারনেট’ শব্দটি আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু ২০২৬-এর শুরুতে এসে আমরা দেখছি প্রাইস হাইকের এক ভয়াবহ রূপ। ইলেকট্রনিক্স এর পাশাপাশি টেলিকম কোম্পানিগুলোও বারবার সাধারণ মানুষের পকেট কাটছে। কিন্তু কেন এই দাম বাড়ছে? এটি কি শুধুই কোম্পানিগুলোর লোভ, নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে বড় কোনো সিস্টেমের খেলা? চলুন আজকের প্রতিবেদনে আমরা বিস্তারিত সবকিছু জেনেনেই।

ফ্রি’ ইন্টারনেটের আড়ালে লুকিয়ে থাকা কৌশল

ইন্টারনেটের দাম কেন এত বাড়ছে তা বুঝতে হলে আমাদের ২০১৬ সালের টেলিকম বাজারের কথা মনে করতে হবে। সেই সময় বাজারে ১০-১২টি টেলিকম প্লেয়ার ছিল (যেমন: Tata Docomo, Telenor, Reliance Communications ইত্যাদি)। সেই সময় আপনার কাছে অপশন বা পছন্দ করার অনেক সুযোগ ছিল।

কিন্তু জিও আসার পর সবকিছু বদলে যায়। জিও কোনো সাধারণ প্রতিযোগী ছিল না; তাদের কাছে ছিল বিশাল পুঁজি। ফ্রি কল আর ফ্রি ডাটা কোনো দান ছিল না, বরং এটি ছিল একটি দীর্ঘমেয়াদী স্ট্র্যাটেজি। যখন কোনো জিনিস আপনি দিনের পর দিন বিনামূল্যে পান, তখন আপনি সেটির গুণমান না দেখে সেটিতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েন। আজ ভারতে মাসে গড়ে এক একজন ইউজার ৩৬ জিবি ডাটা খরচ করেন, যা বিশ্বের মধ্যে সবথেকে বেশি।

Read more- কেন মাউন্ট কৈলাশে চড়লে মানুষ কয়েক ঘণ্টায় বুড়ো হয়ে যায়?

অপশননের মৃত্যু: একচেটিয়া বাজারের দিকে যাত্রা

জিও-র ফ্রি ডাটার চাপে এয়ারটেল (Airtel) প্রায় দেউলিয়া হতে বসেছিল, টাটা ডোকোমো এবং টেলিনর বাজার ছেড়ে চলে যায়। বর্তমানে বাজারে মাত্র তিনটি প্রধান বেসরকারি প্লেয়ার টিকে আছে— Jio, Airtel এবং Vi (Vodafone Idea)।

যখন বাজারে অনেক অপশন থাকে, তখন গ্রাহকরা চাইলেই এক কোম্পানি থেকে অন্য কোম্পানিতে যেতে পারেন। কিন্তু যখন অপশন শেষ হয়ে যায়, তখন গ্রাহককে মানিয়ে নিয়ে চলতে হয়। কোম্পানিগুলো জানে আপনি কোথাও যেতে পারবেন না, তাই তারা এখন নির্ভয়ে দাম বাড়িয়ে চলেছে।

ARPU: নতুন গ্রাহক নয়, পুরনো গ্রাহক থেকেই লাভের চেষ্টা

ভারতের টেলিকম বাজার এখন সেচুরেটে হয়ে গেছে। অর্থাৎ, যাদের সিম নেওয়ার ছিল, তারা নিয়ে নিয়েছেন। এখন কোম্পানিগুলোর কাছে লাভের একটিই উপায় আছে— ARPU (Average Revenue Per User) বাড়ানো। অর্থাৎ, একজন গ্রাহকের কাছ থেকে আগে যদি ১৫০ টাকা আয় হতো, তবে এখন সেটি বাড়িয়ে ৩০০ টাকা করার লক্ষ নেওয়া হয়েছে। এয়ারটেল ইতিমধ্যেই ঘোষণা করেছে যে ব্যবসাকে টেকসই করতে হলে ARPU ৩০০ টাকার ওপরে নিয়ে যেতে হবে।

ডার্ক প্যাটার্ন: আমাদের চোখের আড়ালে যা ঘটছে

টেলিকম কোম্পানিগুলো রিচার্জের ক্ষেত্রে কিছু কৌশল বা ‘ডার্ক প্যাটার্ন’ ব্যবহার করছে যেগুলি নিচে আলোচনা করলাম:

  • ২৮ দিনের বৈধতা: সরকারের কথা অনুসারে ৩০ দিনের প্ল্যান করার কথা ছিল কিন্তু কোম্পানি ৩০ দিনের বদলে ২৮ দিনের রিচার্জ মানে আপনি বছরে ১২ মাসের বদলে ১৩ মাস রিচার্জ করছেন।
  • ন্যূনতম রিচার্জের দাম বৃদ্ধি: জিও ইতিমধ্যেই তাদের ১ জিবি-র সস্তা প্ল্যানগুলো সরিয়ে ১.৫ জিবি-র প্ল্যান বাধ্যতামূলক করেছে।
  • আনলিমিটেড ৫জি-র মোহ: অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় ৫জি টাওয়ার পাশে থাকলেও ফোন ৪জি-তে চলছে। আবার এয়ারটেলের ক্ষেত্রে ৩০০ জিবি ডাটা শেষ হলে আনলিমিটেড সুবিধা বন্ধ হয়ে যায়। তবে জিও এখনও পর্যন্ত আনলিমিটেড ডাটা দিচ্ছে।

Read moreKayadu Lohar Biography

এজিআর (AGR) এবং সরকারের বকেয়া পাওনা

পুরনো কোম্পানিগুলো যেমন এয়ারটেল এবং ভিআই (Vi) অতীতে ২জি, ৩জি স্পেকট্রামের জন্য হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করেছে। তাদের ওপর সরকারের বিশাল অংকের এজিআর (Adjusted Gross Revenue) বকেয়া রয়েছে। নেটওয়ার্ক উন্নত করার কাজে যে টাকা খরচ হওয়ার কথা ছিল, সেই টাকা এখন বকেয়া মেটাতেই চলে যাচ্ছে। অন্যদিকে, জিও নতুন কোম্পানি হওয়ায় তাদের ওপর এই বকেয়ার চাপ অনেক কম, যা তাদের এগিয়ে থাকতে প্রথম থেকেই সাহায্য করছে।

বিএসএনএল (BSNL) এখন আমাদের একমাত্র আশার আলো

বর্তমান পরিস্থিতিতে বিএসএনএল কি কোনো পরিবর্তন আনতে পারবে? টাটা (TCS) এবং সরকারের সাহায্যে বিএসএনএল সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে ৪জি নেটওয়ার্ক তৈরি করেছে, যা ৫জি-তে আপগ্রেড করা সম্ভব। তবে বিএসএনএল-এর প্রধান সমস্যা হলো তাদের বাস্তবায়নের গতি অনেক কম। যদি তারা দ্রুত পরিষেবা উন্নত করতে পারে, তবেই বেসরকারি কোম্পানিগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি হবে। অন্যথায়, ইন্টারনেটের দাম আরও আকাশছোঁয়া হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি।

Read more- জেনারেটিভ এআই এবং কপিরাইট সমস্যা

Read moreMajor Rishabh Singh Sambyal Biography

Leave a Comment

error: Content is protected !!