বাস্তুসংস্থান বলতে কি বোঝায়? গভীর বাস্তুতন্ত্রের উপরে একটি সংক্ষিপ্ত টীকা লেখ।

এই প্রশ্নটি অনেক ভাবেই এসে থাকে যেমন– গভীর বাস্তুতন্ত্রের উপরে একটি সংক্ষিপ্ত টীকা লেখ। অথবা, গভীর বাস্তুসংস্থান-এর উপর একটি টীকা লেখ। অথবা, বাস্তুসংস্থান বলতে কি বোঝায়? গভীর বাস্তুসংস্থানের নীতিগুলি কি কি? আলোচনা কর। অথবা, গভীর ও অগভীর বাস্তুতন্ত্রের মধ্যে পার্থক্য দেখাও?

সূচনা: সংস্থান

বাস্তুসংস্থান হল পরিবেশ সুরক্ষার একটি বিশেষ দিক। যখন একটি নির্দিষ্ট পরিবেশের মধ্যে সুরক্ষিতভাবে মানুষ জীবিকা নির্বাহ করে, সংস্থান করে তখন তাকেই বাস্তুসংস্থান বলা যেতে পারে। গভীর বাস্তুতন্ত্র বা ‘Deep Ecology‘ পরিবেশ নীতিবিদ্যার একটি অন্যতম বিষয়। একথা সত্য যে, পরিবেশ নীতিবিদ্যা সাধারণত পরিবেশ সংরক্ষণের কথা বিশেষভাবে বলে থাকে। আমরা পরিবেশকে কিভাবে রক্ষা করব, কিভাবে ব্যবহার করব, কিভাবে সংরক্ষণ করব, কিংবা পরিবেশ সুরক্ষার নীতি কি হবে প্রভৃতি বিষয় পরিবেশ নীতিবিদ্যা প্রকাশ করে থাকে। 

এছাড়া পরিবেশের অন্তর্ভুক্ত উদ্ভিদ ও বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণীদের কিভাবে সংরক্ষণ করব— সে কথাও পরিবেশ নীতি বিদ্যা প্রচার করে থাকে। পরিবেশ নীতিবিদ্যার এই সব দৃষ্টিকোন থেকে দুটি দৃষ্টিভঙ্গির জন্ম হয়েছে। একটি হল অগভীর বাস্তুতন্ত্র এবং অপরটি হল গভীর বাস্তুতন্ত্র। দার্শনিকগণ এ বিষয়ে বিভিন্ন মতবাদ প্রকাশ করে থাকেন।

অগভীর বাস্তুতন্ত্র:

অগভীর বাস্তুতন্ত্র পরিবেশ নীতিবিদ্যার একটি বিশেষ দিক। এই বাস্তুতন্ত্র পরিবেশ সম্পর্কে আমাদের চিন্তা- চেতনাকে জাগ্রত করে। আমরা কিভাবে পরিবেশকে ব্যবহার করলে সর্বাধিক উপকৃত হবো, এই চিন্তা আমাদের মনে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করে। আমরা একথা সর্বদা ভাবি। অর্থাৎ এই বাস্তুতন্ত্রে পরিবেশকে সম্পদ হিসেবে দেখা হয়। এর সঙ্গে আমাদের অর্থনৈতিক জীবন, সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবন জড়িত হয়ে আছে। এদিক থেকে অগভীর বাস্তুতন্ত্র একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

এই বাস্তুতন্ত্রের রীতি অনুযায়ী আমরা বায়ুদূষণ, জলদূষণ, মৃত্তিকা দূষণ, অরণ্য নিধন প্রভৃতি বন্ধ করার বা রদ করার চেষ্টা করে থাকি। এর মূলে আছে আমাদের পরিবেশ সংরক্ষণের চিন্তা-ভাবনা। তবে অগভীর বাস্তুতন্ত্রে রয়েছে আমাদের সার্থান্বেষী চিন্তাধারা, যা আমাদের কখনোই কাম্য হতে পারে না। অগভীর বাস্তুতন্ত্র সমগ্র পৃথিবীতে জনপ্রিয় হতে পারে না। কারণ এই বাস্তুতন্ত্রে পরিবেশ সুরক্ষিত হয় না। এই বাস্তুতন্ত্রে মানুষের স্বার্থচিন্তা প্রধান্য পেয়ে থাকে। সুতরাং এই বাস্তুতন্ত্রে পরিবেশ সুরক্ষা বিষয়টি মুখ্য নয়। মানুষের স্বার্থচিন্তাই এখানে মুখ্য বা প্রধান। তাই অগভীর বাস্তুতন্ত্র আমাদের কাছে ততটা গ্রহণীয় নয়।

গভীর বাস্তুতন্ত্র:

অগভীর বাস্তুতন্ত্রের এই আপাত চিন্তধারার বিরুদ্ধে যে বাস্তুতন্ত্রের জন্ম হয়েছে, তারই নাম— ‘গভীর বাস্তুতন্ত্র’ বা ‘Deep Ecology‘। এই বাস্তুতন্ত্রে মানুষের স্বার্থ মুখ্য বা প্রধান নয়, পরিবেশের স্বার্থই এখানে মুখ্য বা প্রধান।একথা সর্বসম্মত যে, পরিবেশকে রক্ষা করতে গেলে মানুষের স্বার্থচিন্তা পরিত্যাগ করতে হয়। মানুষের স্বার্থচিন্তা থাকলে আর যাই হোক না কেন পরিবেশ সুরক্ষা হয় না।

সুতরাং মানুষের স্বার্থ ছাড়াই পরিবেশ সংরক্ষণ করা উচিত। কেননা প্রকৃতি বা পরিবেশের একটা মৌলিক বিষয় আছে, এর একটা নিজস্ব প্রক্রিয়া আছে, একটা নিজস্ব মূল্য আছে। তাই পৃথিবীর সকল মানুষকে নিঃস্বার্থভাবে পরিবেশকে সুরক্ষিত করতে হবে, একে রক্ষা করা মানুষের মূল ধর্ম। যা না থাকলে বিশ্ব-প্রকৃতি ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে।

মূল্যায়ন: 

জনৈক কবি বলেছেন— এ বিশ্বকে শিশুর বাসযোগ্য করে যাব কাছে এ আমার অঙ্গিকার। সুতরাং পরিবেশ ও প্রকৃতি নিয়ে মানুষের চিন্তা-চেতনার অন্ত নেই। সুতরাং এই বিশ্বপ্রকৃতিকে রক্ষা করা আমাদের কর্তব্য। গভীর বাস্তুতন্ত্র আমাদের এই কর্তব্যের কথাই বলে থাকে। এই বাস্তুতন্ত্র একথা প্রকাশ করে যে, মানুষ প্রকৃতিকে ব্যবহার করবে ঠিকই, কিন্তু প্রকৃতিকে ধ্বংস করে নয়।

মানুষ প্রকৃতি ও পরিবেশ নির্ভর জাতি। প্রকৃতি ছাড়া মানুষ কখনোই জীবন ধারণ করতে পারে না। তাই প্রকৃতিকে সংরক্ষণ করা মানুষের সব থেকে বড় কর্তব্য। কারণ প্রকৃতির কাছে শুধু নিলেই চলবে না। প্রকৃতিকে আমাদের কিছু দিতেও হবে। এর জন্য আমাদের বনজ উদ্ভিদ, প্রাণিহত্যা করা ও নষ্ট করা ঠিক নয়। কোন প্রজাতিকে বিলুপ্ত করা মানুষের উচিত নয়।

সুতরাং আমাদের প্রকৃতিনির্ভর মানুষকে একথা বলতেই হবে- ফিরায়ে দাও সে অরণ্য, লও এ নগর। আর তা হলেই সার্থক হবে – গভীর বাস্তুতন্ত্র। তবে গভীর বাস্তুতন্ত্র ও অগভীর বাস্তুতন্ত্রের মধ্যে বিপুল পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। অগভীর বাস্তুতন্ত্রে পরিবেশ কখনোই সুরক্ষিত হয় না। কিন্তু গভীর বাস্তুতন্ত্রে পরিবেশ সুরক্ষিত হয়। এছাড়া অগভীর বাস্তুতন্ত্রে মানুষের স্বার্থচিন্তা প্রাধান্য পায়। গভীর বাস্তুতন্ত্রে এইরূপ স্বার্থচিন্তা থাকে না। গভীর বাস্তুতন্ত্রেই মানুষ তার জীবনের মূল্য ফিরে পায়। অগভীর বাস্তুতন্ত্রে মানুষ তার জীবনের মূল্য ফিরে পায় না।

Leave a Comment

error: Content is protected !!