“বন্দেমাতরম্ সুজলাং সুফলাং মলয়জশীতলাম্…“—এই একটি মন্ত্র, যা পরাধীন ভারতের কোটি কোটি মানুষের ধমনীতে স্বাধীনতার আগুন জ্বালিয়েছিল। এই মন্ত্রের স্রষ্টা আর কেউ নন, তিনি হলেন বাংলা সাহিত্যের প্রবাদপ্রতিম পুরুষ, সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (Bankim Chandra Chattopadhyay)।
উনবিংশ শতাব্দীর বাংলা নবজাগরণের অন্যতম স্থপতি বঙ্কিমচন্দ্র কেবল একজন ঔপন্যাসিক ছিলেন না; তিনি ছিলেন আধুনিক ভারতীয় জাতীয়তাবাদের ঋষি। পাশ্চাত্য শিক্ষার আলোয় আলোকিত হয়েও তিনি ভারতীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের শেকড় আঁকড়ে ধরেছিলেন। তাঁর হাতেই বাংলা উপন্যাস সাবালকত্ব লাভ করে। একদিকে ব্রিটিশ সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মচারী হয়েও, তিনি তাঁর লেখনীর মাধ্যমে যে দেশপ্রেমের জোয়ার এনেছিলেন, তা ভারতীয় ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে।
Bankim Chandra Chattopadhyay Biography
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের Quick ইনফরমেশন
| পুরো নাম | বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (Bankim Chandra Chattopadhyay) |
| উপাধি | সাহিত্য সম্রাট (Sahitya Samrat), ঋষি |
| জন্ম তারিখ | ২৬ জুন, ১৮৩৮ |
| জন্মস্থান | কাঁঠালপাড়া, নৈহাটি, পশ্চিমবঙ্গ |
| পিতা ও মাতা | যাদবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ও দুর্গাসুন্দরী দেবী |
| পেশা | ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ও ডেপুটি কালেক্টর, সাহিত্যিক |
| বিখ্যাত উপন্যাস | আনন্দমঠ, দুর্গেশনন্দিনী, কপালকুণ্ডলা, বিষবৃক্ষ |
| অমর সৃষ্টি | ভারতের জাতীয় স্তোত্র ‘বন্দেমাতরম’ (Vande Mataram) |
| সম্পাদিত পত্রিকা | বঙ্গদর্শন (Bangadarshan) |
| মৃত্যু | ৮ এপ্রিল, ১৮৯৪ |
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের জন্ম, শৈশব ও শিক্ষা জীবন
১৮৩৮ সালের ২৬ জুন, উত্তর ২৪ পরগনার নৈহাটির নিকটবর্তী কাঁঠালপাড়া গ্রামে এক রক্ষণশীল ব্রাহ্মণ পরিবারে বঙ্কিমচন্দ্রের জন্ম হয়। তাঁর পিতা যাদবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ছিলেন মেদিনীপুরের ডেপুটি কালেক্ট আর মাতা দুর্গাসুন্দরী দেবী একজন গৃহিনী।
ছোটবেলা থেকেই বঙ্কিমচন্দ্র ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র। তাঁর শিক্ষা জীবন শুরু হয় মেদিনীপুরের ইংরেজি স্কুল থেকে। পরবর্তীতে তিনি হুগলি মহসিন কলেজে ভর্তি হন এবং সেখানেও অসাধারণ মেধার স্বাক্ষর রাখেন।
১৮৫৭ সালে সিপাহী বিদ্রোহের উত্তাল সময়ে তিনি প্রেসিডেন্সি কলেজে আইন নিয়ে পড়াশোনা শুরু করেন। ১৮৫৮ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় যখন প্রথম বি.এ. পরীক্ষার আয়োজন করে, তখন বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এবং যদুনাথ বসু—এই দুজনই ছিলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম গ্র্যাজুয়েট ছাত্র।
Read more– Pritilata Waddedar Biography
বঙ্কিমচন্দ্রের সাহিত্য জীবন ও অমর সৃষ্টি
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে বলা হয় বাংলা উপন্যাসের জনক। তাঁর আগে বাংলা সাহিত্যে সার্থক উপন্যাসের অভাব ছিল। তিনি প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সাহিত্যের সংমিশ্রণে এক নতুন ধারার প্রবর্তন করেন।
প্রথম উপন্যাস: বঙ্কিমচন্দ্রের সাহিত্য জীবন শুরু হয় ইংরেজি উপন্যাস ‘Rajmohan’s Wife‘ দিয়ে। কিন্তু তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে বাঙালির প্রাণের কথা বাংলা ভাষাতেই বলতে হবে। তাই ১৮৬৫ সালে তিনি রচনা করেন বাংলা সাহিত্যের প্রথম সার্থক রোমান্সধর্মী উপন্যাস ‘দুর্গেশনন্দিনী‘ (Durgeshnandini)। এটি প্রকাশিত হওয়ার সাথে সাথেই বাংলা সাহিত্যে এক নতুন যুগের সূচনা হয়।
রোমান্স ও ইতিহাস: এরপর একে একে তিনি উপহার দেন ‘কপালকুণ্ডলা‘ ১৮৬৬ সালে, ‘মৃণালিনী’ (১৮৬৯)-এর মতো কালজয়ী সৃষ্টি। তাঁর লেখনীতে ইতিহাস এবং রোমান্স অপূর্বভাবে মিশে গিয়েছিল।
আনন্দমঠ ও দেশপ্রেম: ১৮৮২ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর শ্রেষ্ঠ কীর্তি ‘আনন্দমঠ‘ (Anandamath)। ছিয়াত্তরের মন্বন্তর এবং সন্ন্যাসী বিদ্রোহের পটভূমিকায় রচিত এই উপন্যাসটি ছিল পরাধীন ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামীদের কাছে ‘গীতা’ স্বরূপ। এই উপন্যাসেই তিনি রচনা করেন ‘বন্দেমাতরম‘ (Vande Mataram) গানটি, যা পরবর্তীতে ভারতের জাতীয় গানের মর্যাদা পায়।
সামাজিক উপন্যাস: ইতিহাসের বাইরে গিয়ে তিনি ‘বিষবৃক্ষ‘ (Bishabriksha) এবং ‘কৃষ্ণকান্তের উইল‘-এর মতো সামাজিক উপন্যাস রচনা করে তৎকালীন সমাজের বিধবা বিবাহ, বহুবিবাহ এবং পারিবারিক জটিলতাকে তুলে ধরেছিলেন।
Read more– Sukanta Bhattacharya Biography
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কর্মজীবন
বঙ্কিমচন্দ্রের কর্মজীবন ছিল বৈচিত্র্যময় এবং চ্যালেঞ্জিং। ১৮৫৮ সালে, মাত্র ২০ বছর বয়সে তিনি ব্রিটিশ সরকারের অধীনে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট এবং ডেপুটি কালেক্টর হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন।
তিনি দীর্ঘ ৩৩ বছর অত্যন্ত দক্ষতার সাথে এই দায়িত্ব পালন করেন। তবে ব্রিটিশ সরকারের অধীনে কাজ করলেও তাঁর মেরুদণ্ড ছিল একেবারে সোজা তিনি কখনোই অন্যায়ের সাথে আপস করেননি। সরকারি চাকরির কঠোর শৃঙ্খলে থেকেও তিনি মনেপ্রাণে ছিলেন একজন খাঁটি দেশপ্রেমিক এবং ভারতীয়। অনেক সময় ব্রিটিশ উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাথে তাঁর মতবিরোধ হয়েছে, কিন্তু তিনি তাঁর আত্মসম্মান বজায় রেখে কাজ করে গেছেন। এই দ্বান্দ্বিক অবস্থানে থেকেও তিনি সাহিত্য চর্চা এবং দেশসেবা চালিয়ে গেছেন।
সাংবাদিকতা ও ‘বঙ্গদর্শন’
বঙ্কিমচন্দ্রের অন্যতম সেরা অবদান হলো ‘বঙ্গদর্শন‘ (Bangadarshan) পত্রিকা। ১৮৭২ সালে তিনি এই মাসিক সাহিত্য পত্রিকাটির প্রকাশ শুরু করেন।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘বঙ্গদর্শন‘ সম্পর্কে বলেছিলেন, “বঙ্গদর্শন আসিয়া বাঙালির হৃদয়সূর্য হরণ করিয়া লইল।“
এই পত্রিকার মাধ্যমেই তিনি বাংলা গদ্যের এক নতুন মানদণ্ড স্থাপন করেন। বিজ্ঞান, ইতিহাস, দর্শন, সাহিত্য—সব বিষয় নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে তিনি বাঙালি জাতিকে জ্ঞানচর্চায় উদ্বুদ্ধ করেছিলেন। তাঁর বহু বিখ্যাত উপন্যাস ধাপে ধাপে এই পত্রিকাতেই প্রকাশিত হতো।
Read more– US President Donald Trump Biography
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের প্রভাব ও মৃত্যু
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় কেবল একজন লেখক ছিলেন না, তিনি ছিলেন এক যুগদ্রষ্টা। পরবর্তীকালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এবং ভারতের অগণিত বিপ্লবী তাঁর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। তিনি শিখিয়েছিলেন কীভাবে ভাষাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে জাতির জাগরণ ঘটানো যায়।
বাংলা সাহিত্যের এই ধ্রুবতারা ১৮৯৪ সালের ৮ এপ্রিল (বাংলা ২৬ চৈত্র, ১৩০০) পরলোকগমন করেন। কিন্তু তাঁর সৃষ্টি ‘আনন্দমঠ‘ এবং মন্ত্র ‘বন্দেমাতরম‘ আজও প্রতিটি ভারতবাসীর হৃদয়ে স্পন্দিত হয়।
Read more– Narayan Debnath Biography
FAQs
প্রশ্ন: সাহিত্য সম্রাট কাকে বলা হয়?
উত্তর: বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে বাংলা সাহিত্যে তাঁর অসামান্য অবদানের জন্য ‘সাহিত্য সম্রাট’ (Sahitya Samrat) বলা হয়।
প্রশ্ন: ‘বন্দেমাতরম’ গানটি কোন উপন্যাসে আছে?
উত্তর: ভারতের জাতীয় স্তোত্র ‘বন্দেমাতরম’ গানটি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের বিখ্যাত উপন্যাস ‘আনন্দমঠ’ (Anandamath)-এ রয়েছে।
প্রশ্ন: বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের প্রথম বাংলা উপন্যাসের নাম কী?
উত্তর: বঙ্কিমচন্দ্রের প্রথম বাংলা উপন্যাসের নাম ‘দুর্গেশনন্দিনী’ (Durgeshnandini), যা ১৮৬৫ সালে প্রকাশিত হয়।
প্রশ্ন: কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম গ্র্যাজুয়েট কে ছিলেন?
উত্তর: বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এবং যদুনাথ বসু ছিলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম স্নাতক বা গ্র্যাজুয়েট।

HelpNbuExam বিগত ৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে পশ্চিমবঙ্গের ছাত্রছাত্রীদের জন্য নির্ভুল এবং কোয়ালিটি স্টাডি মেটিরিয়াল প্রদান করছে। আমি “বিকি দাস” আমি একজন লেখক, SEO Expert, Canva ডিজাইনার। 2022-সালে আমি B.A কমপ্লিট করে SEO এর কোর্স করেছি এবং তখন থেকেই বিভিন্ন ব্লগ, ওয়েবসাইটের জন্যে Biography, Content Writer-এর কাজ করছি। ছাত্রদের স্টাডিতে সাহায্য করার উদ্দেশে পরে HelpNbuExam ব্লগ’টি শুরু করেছি। আপনাদের ভালোবাসায় আজকে এখানে।
