Abanindranath Tagore Biography: আধুনিক ভারতীয় চিত্রকলার জনক অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাইপো বা জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির সদস্য—কেবল এই পরিচয়ে তাঁকে বেঁধে রাখা অসম্ভব। তিনি সেই মানুষটি, যিনি তুলির আঁচড়ে পরাধীন ভারতকে তাঁর নিজের ‘মাতা’র রূপ উপহার দিয়েছিলেন। তিনি অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর (Abanindranath Tagore), আধুনিক ভারতীয় চিত্রকলার জনক।

পাশ্চাত্যের বস্তুবাদী শিল্পরীতিকে বর্জন করে তিনি ভারতীয় আত্মার অনুসন্ধান করেছিলেন এবং ‘বেঙ্গল স্কুল অফ আর্ট’ (Bengal School of Art)-এর মাধ্যমে ভারতীয় চিত্রকলাকে এক নতুন দিশা দেখিয়েছিলেন। স্বদেশী আন্দোলনের যুগে তাঁর আঁকা ‘ভারত মাতা’ ছবিটি কেবল একটি চিত্রকর্ম ছিল না, তা হয়ে উঠেছিল জাতীয়তাবাদের প্রতীক।

একদিকে যেমন তিনি ক্যানভাসে রঙের জাদু সৃষ্টি করেছেন, অন্যদিকে ‘ক্ষীরের পুতুল’ বা ‘বুড়ো আংলা’ লিখে বাংলা শিশুসাহিত্যের জগৎকে সমৃদ্ধ করেছেন। আজকের এই প্রতিবদেনে আমরা Abanindranath Tagore Biography-এর মাধ্যমে তাঁর জীবন, চিত্রকর্ম এবং সাহিত্যের এক বিশদ আলোচনা করব।

Abanindranath Tagore Biography

অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর Quick ইনফরমেশন

পুরো নামঅবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর (Abanindranath Tagore)
উপাধিআধুনিক ভারতীয় চিত্রকলার জনক, শিল্পগুরু
জন্ম৭ই আগস্ট, ১৮৭১
জন্মস্থানজোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ি, কলকাতা
পিতা ও মাতাগুণেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও সৌদামিনী দেবী
বিখ্যাত চিত্রকর্মভারত মাতা, শাহজাহানের মৃত্যু, গণেশ জননী, বাপুজী
বিখ্যাত বইক্ষীরের পুতুল, রাজকাহিনী, বুড়ো আংলা, নালক
প্রধান অবদানবেঙ্গল স্কুল অফ আর্ট প্রতিষ্ঠা, ইন্ডিয়ান সোসাইটি অফ ওরিয়েন্টাল আর্ট প্রতিষ্ঠা
মৃত্যু৫ই ডিসেম্বর, ১৯৫১

অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রারম্ভিক জীবন ও জোড়াসাঁকোর পরিবেশ

১৮৭১ সালের ৭ই আগস্ট কলকাতার বিখ্যাত জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্ম। তিনি ছিলেন গুণেন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং সৌদামিনী দেবীর কনিষ্ঠ পুত্র। সম্পর্কে তিনি ছিলেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাইপো। ঠাকুরবাড়ির সাংস্কৃতিক ও শৈল্পিক পরিবেশ তাঁর মনের গভীরে শিল্পের বীজ বপন করেছিল ছোটবে্লা থেকেই।

শুরুতে তিনি পাশ্চাত্য শিল্পরীতি বা ইউরোপীয় আর্টের প্রতি আকৃষ্ট ছিলেন। তিনি ইতালীয় শিল্পী ওলিন্টো গিলার্ডি (Olinto Ghilardi) এবং ব্রিটিশ শিল্পী চার্লস পামার (Charles Palmer)-এর কাছে তেলরঙ এবং প্যাস্টেলের কাজ শেখেন। কিন্তু শীঘ্রই তিনি অনুভব করেন যে, ইউরোপীয় রিয়েলিজম শৈলী ভারতীয় ভাবাবেগ এবং আত্মাকে প্রকাশ করার জন্য যথেষ্ট নয়। এই উপলব্ধিই তাঁকে ভারতীয় ধ্রুপদী শিল্পের দিকে ফিরিয়ে আনে।

Read morePritilata Waddedar Biography

বেঙ্গল স্কুল অফ আর্ট ও স্বদেশী আন্দোলন

অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর কেবল একজন শিল্পী ছিলেন না, তিনি ছিলেন একটি আন্দোলনের নাম। লর্ড কার্জনের বঙ্গভঙ্গের সময় যখন স্বদেশী আন্দোলন শীর্ষে, তখন অবনীন্দ্রনাথ শিল্পক্ষেত্রেও স্বদেশী আনার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। তিনি মুঘল এবং রাজপুত মিনিয়েচার পেইন্টিং-এর শৈলীকে আধুনিক আঙ্গিকে ফিরিয়ে আনেন এবং জাপানি ‘ওয়াশ টেকনিক‘ (Wash Technique)-এর সংমিশ্রণে এক নতুন ধারার জন্ম দেন, যা ইতিহাসে ‘বেঙ্গল স্কুল অফ আর্ট’ (Bengal School of Art) নামে পরিচিত।

‘ভারত মাতা’ (Bharat Mata Painting): ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের সময় তিনি তাঁর কালজয়ী চিত্রকর্ম ‘ভারত মাতা’ আঁকেন। এই ছবিতে তিনি ভারতকে এক দেবী রূপে কল্পনা করেন, যাঁর চারটি হাত—চার হাতে রয়েছে যথাক্রমে বেদ, ধানের শীষ, জপমালা এবং শ্বেতবস্ত্র। এই ছবিটি পরাধীন ভারতীয়দের মনে দেশমাতৃকার প্রতি ভক্তি ও ত্যাগের আগুন জ্বালিয়েছিল। ভগিনী নিবেদিতা এই ছবিটির ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন এবং এটিকে ভারতীয় স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন।

তাঁর অন্যান্য বিখ্যাত চিত্রকর্মের মধ্যে ‘শাহজাহানের মৃত্যু’ (The Passing of Shah Jahan), ‘গণেশ জননী’, এবং ‘আরব্য রজনী’ সিরিজ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। Abanindranath Tagore paintings list-এ এই কাজগুলো আজও বিশ্ববন্দিত।

Read moreSukanta Bhattacharya Biography

অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাহিত্য প্রতিভার স্বাক্ষর

একজন চিত্রশিল্পী হওয়ার পাশাপাশি অবনীন্দ্রনাথ ছিলেন বাংলা শিশুসাহিত্যের এক অনন্য জাদুকর। তাঁর লেখা ভাষা ছিল ছবির মতোই বর্ণময় এবং প্রাঞ্জল। তিনি ছোটদের জন্য রূপকথা এবং লৌকিক কাহিনীগুলোকে নতুন রূপে পরিবেশন করেছিলেন।

ক্ষীরের পুতুল (Khirer Putul): এটি বাংলা শিশুসাহিত্যের একটি মাইলফলক। রূপকথার মোড়কে লেখা এই গল্প আজও শিশুদের কল্পনার জগতকে রাঙিয়ে তোলে। Khirer Putul writer হিসেবে তিনি আজও সমান জনপ্রিয়।

রাজকাহিনী (Rajkahini): রাজপুত বীরদের শৌর্য-বীর্য এবং ত্যাগের কাহিনী নিয়ে লেখা এই বইটি কিশোর পাঠকদের রক্তে দোলা দেয়। শিলাদিত্য, গোহ বা বাপ্পাদিত্যের গল্প আজও শিহরণ জাগায়।

বুড়ো আংলা ও নালক: সুইডিশ লেখিকা সেলমা ল্যাগেরলফ-এর কাহিনী অবলম্বনে লেখা ‘বুড়ো আংলা’ এবং বুদ্ধদেবের জীবন নিয়ে লেখা ‘নালক’ তাঁর অনবদ্য সৃষ্টি।

শিশুদের জগত ও কুটুম কাটাম

জীবনের শেষ দিকে অবনীন্দ্রনাথ এক নতুন ধরণের শিল্পচর্চায় মেতে ওঠেন, যার নাম তিনি দেন ‘কুটুম কাটাম’ (Kutum Katam)। গাছের ভাঙা ডাল, শিকড়, বা পরিত্যক্ত কাঠ—যা সাধারণ মানুষের কাছে আবর্জনা, অবনীন্দ্রনাথের জাদুকরী স্পর্শে তা হয়ে উঠত এক একটি শিল্পকর্ম। প্রকৃতিকে দেখার এক নতুন চোখ তিনি শিশুদের দিয়েছিলেন এই শিল্পের মাধ্যমে। তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে, শিল্প সৃষ্টির জন্য দামী সরঞ্জামের প্রয়োজন হয় না, প্রয়োজন কেবল সৃষ্টিশীল মনের।

Read moreUS President Donald Trump Biography

অবনীন্দ্রনাথের উত্তরাধিকার ও মৃত্যু

অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর কেবল ছবি এঁকেই ক্ষান্ত হননি, তিনি নন্দলাল বসু, অসিত কুমার হালদার, যামিনী রায়ের মতো একঝাঁক প্রতিভাবান ছাত্র তৈরি করে গিয়েছিলেন, যাঁরা পরবর্তীকালে ভারতীয় শিল্পের মশাল বহন করেছিলেন। তিনি দীর্ঘকাল গভর্নমেন্ট কলেজ অফ আর্ট অ্যান্ড ক্রাফট-এর উপাধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং ‘ইন্ডিয়ান সোসাইটি অফ ওরিয়েন্টাল আর্ট’ প্রতিষ্ঠা করেন।

১৯৫১ সালের ৫ই ডিসেম্বর, ৮০ বছর বয়সে এই মহান শিল্পগুরুর জীবনাবসান ঘটে। কিন্তু তাঁর সৃষ্টি করা বেঙ্গল স্কুল এবং তাঁর সাহিত্যকর্ম আজও তাঁকে অমর করে রেখেছে।

Read moreNarayan Debnath Biography

FAQs

প্রশ্ন: অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে কী বলা হয়?

উত্তর: অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে ‘আধুনিক ভারতীয় চিত্রকলার জনক’ (Father of Modern Indian Art) বলা হয়।

প্রশ্ন: বিখ্যাত ‘ভারত মাতা’ ছবিটি কে এঁকেছেন?

উত্তর: বিখ্যাত ‘ভারত মাতা’ ছবিটি ১৯০৫ সালে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর এঁকেছিলেন।

প্রশ্ন: অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা দুটি বিখ্যাত বইয়ের নাম কী?

উত্তর: অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা দুটি বিখ্যাত বই হলো ‘ক্ষীরের পুতুল’ এবং ‘রাজকাহিনী’

প্রশ্ন: ‘কুটুম কাটাম’ কী?

উত্তর: অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর গাছের ডালপালা, শিকড় ও পরিত্যক্ত কাঠ দিয়ে যে খেলনা বা ভাস্কর্য তৈরি করতেন, তাকেই তিনি ‘কুটুম কাটাম’ নাম দিয়েছিলেন।

Leave a Comment

error: Content is protected !!