Pritilata Waddedar Biography: ‘কুকুর ও ভারতীয়দের প্রবেশ নিষেধ’—এই অপমানের চরম প্রতিশোধ নিয়েছিলেন

১৯৩২ সাল, ২৩শে সেপ্টেম্বর ঘড়ির কাঁটায় তখন রাত ১০টা। চট্টগ্রামের পাহাড়তলী ইউরোপিয়ান ক্লাব তখন সাদা চামড়ার ইংরেজদের হাসি-ঠাট্টায় মত্ত। ক্লাবের গেটে বড় বড় অক্ষরে লেখা— “Dogs and Indians not allowed“। ভারতীয়দের প্রতি এই চরম অপমান আর ঘৃণার জবাব দিতেই সেই রাতে আঁধার চিরে গর্জে উঠেছিল একদল দেশপ্রেমিক। আর সেই অভিযানের নেতৃত্বে ছিলেন একজন ২১ বছরের তরুণী— প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার (Pritilata Waddedar)।

যিনি মাস্টারদা সূর্য সেনের নির্দেশে, পরাধীন ভারতের বুকে দাঁড়িয়ে প্রমাণ করেছিলেন যে, দেশের স্বাধীনতার জন্য নারীরাও অস্ত্র ধরতে জানে, প্রাণ দিতে জানে। তিনি ছিলেন বাংলার প্রথম নারী শহীদ, যিনি ইংরেজদের হাতে ধরা না দিয়ে পটাশিয়াম সায়ানাইড খেয়ে মৃত্যুকে বরণ করে নিয়েছিলেন। এই প্রতিবেদনে Pritilata Waddedar Biography আলোচনা করলাম যেকোনো পরীক্ষায় বেবহার যোগ্য।

Pritilata Waddedar Biography

প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার Quick ইনফরমেশন

পূর্ণ নামপ্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার (Pritilata Waddedar)
উপাধিবীরকন্যা, বাংলার প্রথম নারী শহীদ
জন্ম৫ মে, ১৯১১
জন্মস্থানধলঘাট, পটিয়া, চট্টগ্রাম (বর্তমান বাংলাদেশ)
পিতা ও মাতাজগবন্ধু ওয়াদ্দেদার ও প্রতিভাদেবী
শিক্ষাগত যোগ্যতাবি.এ (দর্শন), বেথুন কলেজ (কলকাতা)
পেশাপ্রধান শিক্ষিকা, নন্দনকানন অপর্ণাচরণ স্কুল
বিপ্লবী গুরুমাস্টারদা সূর্য সেন (Masterda Surya Sen)
প্রধান অভিযানপাহাড়তলী ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণ (১৯৩২)
মৃত্যু২৩ সেপ্টেম্বর, ১৯৩২
মৃত্যুর কারণপটাশিয়াম সায়ানাইড পানে আত্মহত্যা

প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার জন্ম ও শিক্ষা জীবন

প্রীতিলতার জন্ম চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার ধলঘাট গ্রামে আর তাকে ছোটবেলায় আদর করে ডাকা হতো ‘রাণী‘। ডা. খাস্তগীর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯২৮ সালে তিনি লেটার মার্কস নিয়ে ম্যাট্রিক পাশ করেন। এরপর ঢাকার ইডেন কলেজ থেকে আই.এ পাশ করে তিনি ভর্তি হন কলকাতার ঐতিহ্যবাহী বেথুন কলেজে (Bethune College)।

দর্শনশাস্ত্রে (Philosophy) ডিসটিংশন নিয়ে বি.এ পাশ করলেও, ব্রিটিশ সরকার তাঁর ডিগ্রি আটকে রেখেছিল। মেধাবী ছাত্রী হওয়া সত্ত্বেও পরাধীন দেশে তিনি তাঁর প্রাপ্য সম্মান পাননি। তবে, ছাত্রজীবন থেকেই তিনি বিপ্লবী আদর্শে অনুপ্রাণিত ছিলেন এবং মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন যে সশস্ত্র সংগ্রাম ছাড়া ভারতের স্বাধীনতা অসম্ভব।

প্রীতিলতার বিপ্লবী জীবনের প্রস্তুতি

পড়াশোনা শেষ করে তিনি চট্টগ্রামে ফিরে আসেন এবং ‘নন্দনকানন অপর্ণাচরণ স্কুল’-এর প্রধান শিক্ষিকা হিসেবে যোগদান করেন। কিন্তু তাঁর আসল লক্ষ্য ছিল ভারতমাতার সেবা। প্রীতিলতা মনেপ্রাণে চাইতেন মাস্টারদা সূর্য সেনের বিপ্লবী দলে যোগ দিতে।

১৯৩২ সালে ধলঘাট গ্রামে এক গোপন আস্তানায় মাস্টারদা সূর্য সেনের সাথে প্রীতিলতার প্রথম সাক্ষাৎ হয়। মাস্টারদা প্রথমে কোনো নারীকে সশস্ত্র দলে নিতে চাননি, কিন্তু প্রীতিলতার অদম্য সাহস ও দেশপ্রেম দেখে তিনি তাঁকে দলে নেন।

দলের অন্যান্য বিপ্লবীদের সাথে তিনি অস্ত্র চালনা, বোমা তৈরি এবং গেরিলা যুদ্ধের কঠোর প্রশিক্ষণ নেন। এছাড়াও তাঁর ছদ্মনাম ছিল ‘ফুলতার‘।

Read moreBiography of Cricket Player Ramakrishna Ghosh

পাহাড়তলী ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণ

মাস্টারদা সূর্য সেন সিদ্ধান্ত নেন যে পাহাড়তলী ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণ করে ইংরেজদের ঔদ্ধত্য চূর্ণ করতে হবে। এই ক্লাবে ভারতীয়দের প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল এবং ভারতীয়দের ‘কুকুর‘-এর সাথে তুলনা করা হতো। মাস্টারদা এই অভিযানের দায়িত্ব তুলে দেন প্রীতিলতার কাঁধে।

  • তারিখ: ২৩ সেপ্টেম্বর, ১৯৩২।
  • ছদ্মবেশ: আক্রমণের সুবিধার জন্য প্রীতিলতা পাঞ্জাবি পুরুষের ছদ্মবেশ ধারণ করেন। তাঁর সাথে ছিলেন আরও কয়েকজন দুঃসাহসী বিপ্লবী।
  • আক্রমণ: রাত ১০টা বেজে ৪৫ মিনিট নাগাদ প্রীতিলতার নেতৃত্বে বিপ্লবীরা ক্লাবটি চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে বোমা ও গুলি বর্ষণ শুরু করেন। ক্লাবের ভেতরে তখন আতঙ্কের ঝড় বয়ে যায়।

Read moreBiography of Cricket Player Swapnil Singh Biography

প্রীতিলতার মহান আত্মত্যাগ ও মৃত্যু

আক্রমণ সফল হয়েছিল, কিন্তু ফেরার পথে এক ইংরেজ অফিসারের গুলিতে প্রীতিলতা আহত হন। তিনি বুঝতে পারেন যে আহত অবস্থায় পালানো অসম্ভব। অন্যদিকে, ব্রিটিশ পুলিশের হাতে ধরা পড়লে দলের গোপন তথ্য ফাঁস হওয়ার বা অকথ্য নির্যাতনের শিকার হওয়ার সম্ভাবনা ছিল।

প্রীতিলতা ছিলেন অপরাজেয় তিনি জীবিত অবস্থায় শত্রুর কাছে ধরা না দেওয়ার সংকল্প করেছিলেন। তাই নিজের কাছে রাখা পটাশিয়াম সায়ানাইড (Potassium Cyanide) পান করে তিনি নিজের জীবন ত্যাগ করেন। পরদিন সকালে পুলিশ তাঁর মৃতদেহ উদ্ধার করে তাঁর পকেটে পাওয়া যায় এক ঐতিহাসিক চিঠি, যেখানে তিনি লিখেছিলেন— কেন একজন নারী হয়ে তিনি অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন, তাঁর এই আত্মত্যাগ যেন ভারতের নারীদের জাগিয়ে তোলে।

প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার উত্তরাধিকার ও সম্মাননা

প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের আত্মত্যাগ বৃথা যায়নি। তাঁর মৃত্যু ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে নারীদের অংশগ্রহণের পথ প্রশস্ত করেছিল।

মরণোত্তর ডিগ্রি: ২০১২ সালে, অর্থাৎ তাঁর মৃত্যুর ৮০ বছর পর, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে মরণোত্তর স্নাতক (B.A) ডিগ্রি প্রদান করে সম্মান জানায়।

স্মৃতিসৌধ: বাংলাদেশ ও ভারতের বিভিন্ন স্থানে তাঁর নামে স্কুল, হল এবং স্মৃতিস্তম্ভ রয়েছে তিনি আজও দুই বাংলার মানুষের কাছে সাহসের প্রতীক।

Read moreWomen Cricket Player Richa Ghosh Biography

শেষকথা

ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে বীরকন্যা প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার কেবল একটি নাম নয়, একটি জ্বলন্ত অধ্যায়। পরাধীন ভারতের বুকে দাঁড়িয়ে যিনি অসীম সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছিলেন, তিনি আজও কোটি মানুষের হৃদয়ে জীবিত। মাত্র ২১ বছর বয়সে দেশের জন্য তাঁর এই সর্বোচ্চ আত্মত্যাগ যুগে যুগে নারীদের কাছে এক অফুরান অনুপ্রেরণার উৎস। মাস্টারদা সূর্য সেনের এই যোগ্য শিষ্যার দেশপ্রেম ও আদর্শ আজও আমাদের মাথা নত করে স্মরণ করিয়ে দেয় স্বাধীনতার আসল মূল্য।

FAQs

প্রশ্ন: প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার কে ছিলেন?

উত্তর: প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার ছিলেন ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের এক কিংবদন্তি বিপ্লবী এবং বাংলার প্রথম নারী শহীদ। তিনি মাস্টারদা সূর্য সেনের নেতৃত্বে পাহাড়তলী ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।

প্রশ্ন: প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার কীভাবে মারা যান?

উত্তর: ১৯৩২ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর পাহাড়তলী ক্লাব আক্রমণের পর ব্রিটিশদের হাতে ধরা পড়া এড়াতে তিনি পটাশিয়াম সায়ানাইড পান করে আত্মহত্যা করেন।

প্রশ্ন: পাহাড়তলী ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণ কবে হয়েছিল?

উত্তর: ১৯৩২ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের নেতৃত্বে এই ঐতিহাসিক আক্রমণ সংঘটিত হয়েছিল।

Leave a Comment

error: Content is protected !!